বছরে ঝরছে ৩০০ প্রাণ, বেশি মার্চ-মে মাসে; বজ্রধ্বনি শুনলেই যেতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ে
বছরে ঝরছে ৩০০ প্রাণ, বেশি মার্চ-মে মাসে; বজ্রধ্বনি শুনলেই যেতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ে
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
Manual3 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
সারা দেশে কয়েকদিনে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৪০ জনেরও বেশি মানুষ। মাঠে কাজ করতে গিয়ে, মাছ ধরতে গিয়ে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে-প্রতিবছর এভাবে ৩ শতাধিক মানুষ মারা যান। আর প্রতিবছরই বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটু সচেতন হলেই এ মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু কোনোমতেই কমছে না এই প্রাণহানি; বরং বছরের পর বছর বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।
মার্চ থেকে মে-এই তিন মাস বাংলাদেশে প্রাক-বর্ষার মৌসুম। সারা বছরের বজ্রঝড়ের ৩৮ শতাংশ এ সময়েই হয়। এপ্রিলে শুরু হয় তাণ্ডব। মে মাসে পৌঁছায় সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে। এ সময়ে গড়ে ১৩ দিন বজ্রঝড় হয়। সঙ্গে থাকে দমকা হাওয়া আর শিলাবৃষ্টি।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সচেতনতা ও সাবধানতা বজ্রপাতে মৃত্যু কমানোর প্রধান উপায়। বজ্রধ্বনি শোনামাত্রই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, চলতি বছর মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বৃষ্টিপাত হয়েছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। অর্থাৎ, বজ্রপাতের ঝুঁকিও থাকবে।
কেন বাংলাদেশে এত বজ্রপাত : ভৌগোলিক অবস্থানই এর মূল কারণ। দক্ষিণ-পশ্চিমদিক থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস বাংলাদেশে ঢোকে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সেই বাতাস উপরে উঠে যায়। ঠান্ডা হয়। আর উত্তর-পশ্চিম থেকে আসে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস। এ দুই বাতাসের সংঘাতে তৈরি হয় বজ্রমেঘ। এর ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, পাবনা, রংপুর ও রাজশাহী এলাকায় বেশি বজ্রপাত হয়। এছাড়াও রয়েছে বায়ুদূষণ। বাতাসে সালফেট কণা বাড়লে বজ্রমেঘ তৈরিতে সহায়তা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাষ্পায়নের হার বাড়ছে। ফলে বজ্রপাতও বাড়ছে।
Manual6 Ad Code
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশে এই বজ্রঝড়ের আয়ুষ্কাল আধা ঘণ্টা থেকে বড়জোর দুই ঘণ্টা হতে দেখা যায়। এ সময়ের মধ্যেই এই ঝড় তৈরি হয়ে তার তাণ্ডব চালায়। যদি প্রান্তিক পর্যায়ের চাষি, মৎস্যশিকারি থেকে খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষকে বজ্রমেঘ চেনানো যায় এবং সতর্কতা অবলম্বন করা যায়, তাহলে বজ্রপাতে মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
Manual4 Ad Code
বজ্রমেঘ চেনার উপায় : আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিম কোণে যদি অস্বাভাবিক উঁচু মেঘ দেখা যায় এবং সেই মেঘ ক্রমশ উপরে উঠতে থাকে-সেটাই বজ্রমেঘ। একে বলা হয়, কিউমুলোনিম্বাস বা থান্ডার ক্লাউড। এ মেঘ ভূপৃষ্ঠ থেকে ৮ থেকে ১২ কিলোমিটার, কখনো ১৮ থেকে ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে উঠতে পারে। এ মেঘ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয় নিতে হবে নিরাপদ স্থানে।
Manual4 Ad Code
থার্টি বাই থার্টি নিয়ম : বজ্রপাতের আলো দেখামাত্র গণনা শুরু করতে হবে। ৩০ পর্যন্ত গোনার মধ্যে যদি শব্দ শোনা যায়, বুঝতে হবে বজ্রঝড় একদম কাছে। তখন অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের ভেতরে থাকতে হবে। আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বজ্রধ্বনি শোনা মানেই হলো আপনি বজ্রপাতের এলাকার আওতায় আছেন। অতি দ্রুত ঘরে চলে যান। এটাই সবচেয়ে বড় মন্ত্র। তিনি আরও বলেন, খোলা মাঠ, গাছের নিচে, জলাধারেরর মধ্যে থাকা যাবে না। ঘুড়ি উড়ানো যাবে না। শিলাবৃষ্টি হলে ঘরে থাকতে হবে। জানালা ও দরজা বন্ধ রাখতে হবে। খোলা মাঠে টিনের চালাযুক্ত ঘরও নিরাপদ নয়। ঘরের কাচের জানালা বা রড ধরা যাবে না। বৈদ্যুতিক ডিভাইসগুলোর প্লাগ খুলে রাখতে হবে। কংক্রিটের মেঝেতে শোয়া যাবে না এবং কংক্রিটের দেওয়ালে হেলান দেওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ পরিবাহক বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বজ্রপাতের সময় ছাতাও নিরাপদ নয়। রাবারের জুতাও নয়। বজ্রপাতে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় বলে এসব নিরোধোক কোনো কাজেই আসবে না। জনসচেতনতা এবং আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম মেনে চলাই সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যু বাড়ছে দশকের পর দশক : বাংলাদেশের বজ্রপাতবিষয়ক এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে গড়ে বছরে মারা গেছেন ৩০ জন আর আহত হয়েছেন ২২ জন। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গড়ে মারা যান ১০৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৭২ জন। ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গড়ে মারা গেছেন ২৬০ জন এবং আহত হয়েছেন ২১১ জন। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, এখন প্রতিবছর বাংলাদেশে বজ্রপাতে ৩০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান।
আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে অধিক বজ্রঝড় ও বজ্রপাত হওয়ার মতো আবহাওয়া তৈরি হয়ে আছে।
আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন , চলতি বছর মার্চজুড়ে বৃষ্টিপাত ছিল। এপ্রিলের শুরুতেও বৃষ্টিপাত ছিল, শেষেও বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এ ধারায় বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। তাই বজ্রপাতও সংঘটিত হবে। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। সবচেয়ে নিরপাদ স্থান হলো পাকা ঘর। খেয়াল রাখতে হবে, বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরে থাকলেও ধাতব কিছুর সঙ্গে শরীরের কোনো অংশ সংযুক্ত রাখা যাবে না। বজ্রপাতের শব্দ শোনামাত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে।