২৮০ দিন ধরে বিনা বিচারে কারাগারে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক
২৮০ দিন ধরে বিনা বিচারে কারাগারে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ণ
Manual1 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বয়স এখন ৮১ বছর। কোনো মামলায় বিচার বা দণ্ড ছাড়াই তিনি ২৮০ দিন ধরে কারাগারে আছেন।
তার বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলাতেই আদালতে চার্জশিট জমা দেয়নি পুলিশ।
গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচটি মামলায় তার জামিন বহাল রেখেছেন। তবে তিনি কবে মুক্তি পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের দুটি পৃথক হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একটি যাত্রাবাড়ী ও অন্যটি আদাবর থানায়।
গত ৩০ মার্চ ঢাকার একটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পুলিশি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।
হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন খায়রুল হক। তার আইনজীবীরা জামিন চেয়ে ২০১৬ সালে সাংবাদিক শফিক রেহমানের মামলার একটি রায়ের নজির তুলে ধরেন।
ওই রায়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ বলেছিল, বিচারের আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জামিন নামঞ্জুর করে জেলে আটকে রাখা উচিত নয়।
আদালত আরও বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ (১) ধারার আলোকে অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাকে জামিনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
শফিক রেহমানের ক্ষেত্রে আদালত উল্লেখ করেন, তিনি ৮২ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তি হওয়ায় এবং তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় তাকে জামিন দেওয়া যুক্তিযুক্ত। তবে এই নজির উপস্থাপন করা হলেও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত খায়রুল হককে জামিন দেননি।
এর আগে চলতি বছরের ৮ মার্চ হাইকোর্ট চারটি মামলায় তাকে স্থায়ী জামিন দেন। এই জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট আপিল বিভাগের সাংবাদিক শফিক রেহমানের সেই পর্যবেক্ষণটি অনুসরণ করেছে।
Manual6 Ad Code
এছাড়া, ১১ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলাতেও তিনি জামিন পান।
খায়রুল হককে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রায় এক বছর পর গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই আছেন।
তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যার অভিযোগসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যার ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা করা হয়।
এছাড়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত রায় জালিয়াতির অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
গত বছরের ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও বন্দর থানায় একই ধরনের আরও দুটি মামলা করা হয়।
জালিয়াতির মামলাগুলো প্রসঙ্গে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন, সংশ্লিষ্ট রায়টি আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চের দেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত—এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
আদালত বলেন, প্রাথমিকভাবে অভিযোগগুলো বিচারিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে উদ্ভূত বলে মনে হয়। এসব কার্যক্রম দণ্ডবিধির ২১৯/৪৬৬/১২০বি/৪২০ ধারার আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারাধীন পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে।
খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। আপিল বিভাগের ওই বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক তার সঙ্গে একমত ছিলেন।
Manual5 Ad Code
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয় ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, তার অবসরের প্রায় ১৬ মাস পর।
সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সব নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা করতে বাধ্য—যার মাধ্যমে আদালতের আদেশ দেশজুড়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে গত বছরের ২০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ ২০১১ সালের ওই রায় বাতিল করে দেয়।
২০১১ সালের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি আপিল ও চারটি রিভিউ আবেদন মঞ্জুর করে বেঞ্চটি সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় দেয়।
Manual3 Ad Code
বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর অবসরে যান। তবে ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয় চলতি বছরের ১৫ মার্চ।
এর আগে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকেও অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা সব সরকার (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণসহ) বৈধতা পেয়েছিল।
Manual4 Ad Code
একই দিনে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারক হাইকোর্টের ওই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়।