আজ মঙ্গলবার, ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকাশ্যে এলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ১৪ দফা

editor
প্রকাশিত জুন ১৮, ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ
প্রকাশ্যে এলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ১৪ দফা

Manual4 Ad Code

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গত সপ্তাহের শেষদিকে অর্জিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অফিসিয়াল পাঠ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ গোপনীয়তার পর এই চুক্তির বিবরণী জনসমক্ষে না আনায় তীব্র সমালোচনার মুখে বুধবার (১৭ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ দফার এই নথিটি প্রকাশ করা হয়।

মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই সমঝোতার বিশদ বিবরণ পড়ে শোনান, যাতে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে প্রত্যাশিত রূপরেখা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ শিরোনামের এই চুক্তিটি আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।

এর মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই পক্ষ ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময়সীমা পাবে। এর আগে সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই চুক্তির একটি খসড়া প্রকাশ করেছিল, যার সাথে মার্কিন প্রশাসনের অবমুক্ত করা মূল দলিলের বেশ মিল রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হবে এবং ইরান তাদের উৎপাদিত পারমাণবিক বর্জ্য ধ্বংস করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এর বিপরীতে ইরান যদি তাদের ইতিবাচক আচরণ বজায় রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্রও ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করবে, যা ইরানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।

অফিসিয়াল নথিতে প্রকাশিত ১৪ দফার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে প্রথম দফায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানসহ চলমান যুদ্ধে লিপ্ত তাদের মিত্র দেশগুলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে। কোনো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা সামরিক পদক্ষেপ নেবে না এবং লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে।

Manual4 Ad Code

দ্বিতীয় দফায় দুই দেশই পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে। তৃতীয় দফা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের জন্য আলোচনা সম্পন্ন করা হবে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বর্ধিত করা যেতে পারে।

Manual5 Ad Code

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে চুক্তিটির চতুর্থ ও পঞ্চম দফা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাক্ষর হওয়ার সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ শেষ করবে। একই সাথে ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিনামূল্যে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে। নৌপথের প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা এবং মাইন অপসারণের কাজও ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নৌ-পরিষেবা ও প্রশাসনের বিষয়ে ওমান ও অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সাথে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আলোচনা করবে ইরান।

Manual3 Ad Code

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আর্থিক সহায়তার বিষয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে মিলে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করবে। চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রকার একতরফা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা একটি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রত্যাহার করা হবে।

দশম ও একাদশ দফায় বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত খনিজ তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা ও পরিবহনের জন্য বিশেষ ছাড়পত্র (ওয়েভার) জারি করবে। পাশাপাশি ইরানের অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করে রাখা সমস্ত তহবিল ও সম্পদ অবমুক্ত করা হবে, যা ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত যেকোনো সুবিধাভোগী ব্যবহার করতে পারবেন।

Manual1 Ad Code

পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে অষ্টম দফায় ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না। মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে অন-সাইট ব্লেন্ডিং বা নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি এবং ইরানের পারমাণবিক চাহিদার বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে। নবম দফা অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তির আগ পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে। অর্থাৎ ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না বা এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করবে না। ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, এই সমঝোতা ও চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর নজরদারির জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রাথমিক কিছু ধারা বাস্তবায়ন সাপেক্ষে বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

এর আগে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই সমঝোতা স্মারকটিকে একটি ‘রাজনৈতিক দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করে এর গুরুত্ব কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তেহরানের পর্দার আড়ালের গোপন প্রতিশ্রুতিগুলোর সম্পূর্ণ প্রতিফলন নয়।

অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম পূর্বে ফাঁস হওয়া খসড়া সংস্করণের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তবে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন।