২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
editor
প্রকাশিত আগস্ট ১৬, ২০২৬, ১১:১১ অপরাহ্ণ
Manual4 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
গ্যাস সংকটের কারণে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে অবস্থিত আরপিসিএলের (রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড) ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৬ দিন ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অচল থাকায় এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্য দুটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তবে এটিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দোষ বলে মন্তব্য করেছেন ময়মনসিংহ আরপিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ।
আরপিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে শম্ভুগঞ্জে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২১০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর অঞ্চলটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) আর এই প্রকল্পে গ্যাস সরবরাহের জন্য যে পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন করেছে সঞ্চালন সংস্থা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বর্তমানে শূন্যে নেমে এসেছে। কেন্দ্রটির উৎপাদন গত ২৬ দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে। এতে ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয় মূলত ওই অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে। সেই সঙ্গে এলাকাটি শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হবে এমন লক্ষ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলনও ছিল। এ লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। তিন ধাপে এই প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকাও বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রটি বছরের পর বছর গ্যাস সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর দেশে গ্যাস সংকট বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্রটিতে গ্যাসের সরবরাহ কমতে থাকে।
আরপিসিএলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে ৩০-৩৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। এ পরিস্থিতি চলছে বছরের পর বছর। গ্যাস সংকটের কারণে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের নাজুক পরিস্থিতিও উঠে এসেছে আরপিসিএলের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত উৎপাদন চিত্রে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরপিসিএলের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মাসভিত্তিক উৎপাদন কোনও কোনও মাসে ৪০ মেগাওয়াটের নিচেও নেমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৪৫ শতাংশ। তার আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫-৭০ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে অব্যাহতভাবে কেন্দ্রটির উৎপাদন হ্রাস পায়। এভাবে এতদিন চলছিল। কিন্তু এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে গত ২৬ দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ হয়ে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ আরপিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ রবিবার (১৬ আগস্ট) বলেন, ‘সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছিল যে, তেল-গ্যাস ও খনিজ পদার্থ সাপ্লাইয়ের জন্য। এর জন্য চুক্তি হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তেল-গ্যাস ও খনিজ পদার্থ সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকটসহ গ্যাসের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এজন্য এখন আমাদের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে ২৬ দিন ধরে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে আছে। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটতির কারণে এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ বিভাগে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ রান্নাবান্নাও করতে পারছে না। অনেক সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। মানুষের কষ্ট হচ্ছে খুব। তবে সমস্যার সমাধান হলে আমরা যদি গ্যাস সরবরাহ পেয়ে যাই তাহলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবারও উৎপাদন শুরু করতে পারবো।’
Manual6 Ad Code
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি
এদিকে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহ বিভাগে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা এবং জেলা শহরে তিন-চার ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে প্রতিদিন। এতে খামারিরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বয়স্ক এবং শিশুরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
Manual1 Ad Code
‘দিনেরাতে ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭-১৮ ঘণ্টাই থাকে না। বিদ্যুতের এত খারাপ অবস্থা গত ১০-১২ বছরেও দেখি নাই, একবার গেলে তিন-চার ঘণ্টায়ও আসে না। এলেও কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যায়। রাতের বেশিরভাগ সময় অন্ধকারে থাকি। গরমে ঘুমানো যায় না। ছেলেমেয়েরাও লেখাপড়া করতে পারে না।’ কথাগুলো বলেছেন ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের ভ্যানচালক নাসির উদ্দিন।
Manual4 Ad Code
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এই কথা মিথ্যা বলছেন নগরের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, শহরে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তিন-চার ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হলে তাদের এত ভোগান্তি হতো না।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা ও নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার বলেন, ‘আগে তো এক থেকে দুবার লোডশেডিং ছিল। এখন প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমার এলাকায় চার বার লোডশেডিং দেওয়া হয়। আর রাতেও চার বার লোডশেডিং। প্রতিবারই এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং। এর সঙ্গে বাসায় গ্যাস সংকট লেগেই আছে। একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে গ্যাস নেই। কীভাবে রান্নাবান্না করবো। কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এই সংকট কবে শেষ হবে, কেউ কিছু বলছেও না। কোনও ভালো খবরও পাচ্ছি না। এভাবে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।’