আজ মঙ্গলবার, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছেলেকে মৃত দেখিয়ে মামলা; শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদেরসহ ১২৪ জনের দোষ পায়নি পুলিশ

editor
প্রকাশিত মার্চ ১৯, ২০২৬, ০৯:২৮ অপরাহ্ণ
ছেলেকে মৃত দেখিয়ে মামলা; শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদেরসহ ১২৪ জনের দোষ পায়নি পুলিশ

Manual3 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

পুরান ঢাকার কেরানীগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জিহাদ (১১) নামে এক কিশোরকে হত্যার অভিযোগের মামলায় তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৪ জনের অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে রয়েছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন।

তদন্তে ভুক্তভোগী জিহাদ জীবিত থাকা ও ঘটনাস্থল নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থানে (হাজারীবাগ) জখম হওয়ার ঘটনাকে কেরানীগঞ্জে ‘হত্যা’ সাজিয়ে দায়ের করা এই মামলায় ‘তথ্যগত ভুল’ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না এই অব্যাহতির আদেশ দেন।

​কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক বদিয়ার রহমানের ফাইনাল প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ তদন্ত কর্মকর্তা গত বছরের ১১ আগস্টে তদন্ত শেষে আদালতে এ প্রতিবেদন জমা দেন। পরে আদালত পর্যালোচনা শেষে ওই বছরের ৩০ নভেম্বরে মামলাটি থেকে সব আসামিকে অব্যাহতির আদেশ দেন। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) কেরানীগঞ্জ মডেল থানার জিআরও আবদুল নূর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

Manual5 Ad Code

আদালতের আদেশে বলা হয়, মামলার এজাহার, চার্জশিট এবং ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, এটি হত্যা মামলা হলেও ভুক্তভোগী জীবিত রয়েছে। তিনি শুধু জখমপ্রাপ্ত হয়েছেন; যা স্বয়ং নিজেই আদালতে স্বীকার করেছে। এ অবস্থায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় দায়ের করা মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

ঘটনা ও মামলার প্রেক্ষাপট

​মামলার এজাহারে বাদী মো. জহিরুল ইসলাম রাজু অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের সময় কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওয়াশপুর বছিলা ব্রিজের নিচে আসামিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে জিহাদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই অভিযোগে একই বছরের ৮ অক্টোবর কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন বাদী। মামলায় শেখ হাসিনাসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিসহ ১২৪ জনকে আসামি করা হয়।

Manual8 Ad Code

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ওই সময়ে (জুলাইয়ে) অনেক স্বার্থান্বেষী মহল সিন্ডিকেট করে এ ধরনের মামলা করেছে। সেগুলোতে পুলিশ তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিচ্ছে। বাদীর শাস্তির বিষয়ে ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করলে অবশ্যই বাদীর শাস্তির বিধান আইনে আছে। যদিও আমাদের দেশে এর নজির খুব কম।

Manual5 Ad Code

এ বিষয়ে আলোচিত সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, এ ধরনের মিথ্যা মামলা যারা করে ওইসব বাদীদের ধরে আটকানো উচিত। তাদের আইনের আওতায় আনতে পারলে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে আর কেউ এমন মিথ্যা মামলা করে মানুষকে হয়রানির আগ্রহ পাবেন না।

এ বিষয়ে এ মামলায় সন্দেহপ্রবন আসামি আব্দুল মতিন হাওলাদারের আইনজীবী ওবাইদুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের মিথ্যা মামলা খুবই দুঃখজনক। মামলাটি হওয়ার সময়ই তদন্ত করে আমলে নেওয়া উচিত ছিল। বাদীকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমার মোয়াক্কাল মতিন হাওলাদার এই মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে ১৫ মাসের বেশি কারাগারে আছে। অথচ মামলাটিতে কেউ জড়িত নেই বলে আদালত সবাইকে অব্যাহতি দিয়েছেন।

Manual2 Ad Code

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপ-পরিদর্শক বদিয়ার রহমান বলেন, মামলাটিতে দুটি ভুল হয়। জীবিতকে মৃত দেখানো এবং আশুলিয়ার ঘটনায় কেরানীগঞ্জে মামলা করা; যা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এ জন্য তদন্ত শেষে সত্যতা না পেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছি। তবে ঘটনার প্রকৃতস্থলে বাদীর ছেলে আহত হওয়ার ঘটনায় আবারও মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাদী কারও প্ররোচনা এবং লোভে মামলাটি করেছেন এ বিষয় জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে বাদীকে জিজ্ঞেস করেন। এই মিথ্যা মামলা দেওয়ার কারণে তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালতের সময় নষ্ট হয়।

তবে এর কারণে বাদীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এ সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা কিছু জানাননি। পরে বারবার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয় জানতে মামলার বাদী জহিরুল ইসলামের মামলার নথিতে দেওয়া নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

মামলাটিতে রিমান্ড ও জবানবন্দি

​মামলাটি দায়েরের পর তদন্ত চলাকালীন কেরানীগঞ্জ মডেল থানা-পুলিশ ও ডিবি পুলিশ বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. হাবিবুর রহমান, মো. মিন্টু ও মো. ইসমাইলকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে তদন্তের এক পর্যায়ে দেখা যায়, মামলার মূল ভিত্তি অর্থাৎ ভুক্তভোগীর মৃত্যু নিয়ে চরম অসঙ্গতি রয়েছে।

তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য

​পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, বাদীর ছেলে জিহাদ আসলে মারা যায়নি। সে বর্তমানে সুস্থ ও জীবিত আছে। পরবর্তী সময়ে আদালত কিশোর জিহাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে সে নিজেই বলে, সে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুবরণ করেনি। সে ৫ আগস্ট বিকালে সাভারের বাইপাইল এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে বাম পায়ের গোড়ালিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে জখম হয়েছিল এবং এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।

তদন্তে আরও প্রমাণিত হয়, ঘটনাস্থল কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অধীনে দাবি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ডিএমপি ঢাকার হাজারীবাগ থানার অন্তর্গত এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার মূল ঘটনাটি ঘটেছিল সাভার এলাকায়। কিছু অসাধু ব্যক্তির প্ররোচনায় এবং আর্থিক লাভের আশায় বাদী জহিরুল ইসলাম রাজু তার জীবিত ছেলেকে মৃত সাজিয়ে এই মামলা দায়ের করেন।

তথ্য সুএঃবাংলা ট্রিবিউন