ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়, যতটা ওয়াশিংটন ভাবে: অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়, যতটা ওয়াশিংটন ভাবে: অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০৮:১৮ অপরাহ্ণ
Manual1 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সদ্য সমাপ্ত ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)কে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তাঁর মতে, এই চুক্তি ওয়াশিংটনের কাছে একটি বার্তা দেয় যে নয়াদিল্লি ও ব্রাসেলস যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ততটা নির্ভরশীল নয়, যতটা যুক্তরাষ্ট্র ধরে নেয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তি একা অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে পারবে না।
Manual6 Ad Code
পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, যা টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া প্রকাশ করেছে, অভিজিৎ বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত উচ্চ শুল্কের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে দক্ষতা, লজিস্টিকস ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি না হলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিতই থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
Manual3 Ad Code
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এটি অবশ্যই একটি কৌশলগত সমন্বয়। ইউরোপ ও ভারতের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র যতটা ভাবে, আমরা ততটা তাদের ওপর নির্ভরশীল নই। যদি লক্ষ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রকে দরকষাকষির টেবিলে আনা, তাহলে এটি কাজে লাগতে পারে।’ একই সঙ্গে তিনি এই চুক্তি বাস্তবে কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেন।
ভারত–ইইউ এফটিএ প্রসঙ্গে, যাকে প্রায়ই ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলা হয় এবং যার লক্ষ্য প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি যৌথ বাজার তৈরি করা, অভিজিৎ জোর দিয়ে বলেন, বাণিজ্য চুক্তি কেবল শুরু মাত্র।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য চুক্তি শুধু একটি সূচনা। বিক্রি করার মতো পণ্য থাকতে হবে এবং বাজারকেও সেই পণ্য চাইতে হবে।’ তার মতে, বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতা কেবল শুল্ক কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এই চুক্তির আওতায় ইইউতে ভারতের ৯৯ শতাংশ রপ্তানির ওপর শুল্ক উঠে যাবে এবং ভারতে ইইউর ৯৭ শতাংশের বেশি রপ্তানিতে শুল্ক কমবে। এতে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ অন্তর্ভুক্ত হবে। ভারতের বস্ত্র, পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, জুতা ও সামুদ্রিক পণ্য খাত উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ লাভবান হতে পারে মদ, গাড়ি, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পে।
Manual3 Ad Code
অভিজিৎ বলেন, ভারত বস্ত্র, চামড়া ও গয়নার মতো খাতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তবে ফলাফল একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘গয়না ও চামড়ায় আমরা অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক, আর বস্ত্রে হয়তো কিছুটা কম—যদিও সেটা বস্ত্রের ধরন অনুযায়ী বদলায়।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশও প্রতিযোগিতামূলক এবং ‘তারা আমাদের থেকে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে’।
ভারতের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে তিনি লজিস্টিকস ও দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন।
অভিজিৎ বলেন, ‘আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলি, তারা বলে ভারতীয়রা ধীরগতির। আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা কার্যকর নয়, বন্দরগুলো ধীর—এই সব বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।’
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রপ্তানি ছিল প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ৬০ বিলিয়ন ডলার।
Manual6 Ad Code
চীনের সঙ্গে তুলনা টেনে অভিজিৎ বলেন, দ্রুত সরবরাহের কারণে সেখানকার সরবরাহকারীরা প্রায়ই বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে।
তিনি বলেন, ‘একই দামে যদি একটি দেশ দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে, ক্রেতারা সেই দেশকেই বেছে নেবে।’ ভারতের উচিত ‘চীনের মতো দক্ষতার স্তরে পৌঁছানো’, তাহলেই বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দক্ষতায় পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে উঠতে হবে। যদি আমরা চীনের মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারি, তাহলে এই চুক্তিগুলো থেকে লাভ নিশ্চিতভাবেই আসবে। কিন্তু এটা স্বয়ংক্রিয় নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ মার্কিন শুল্ক—যার মধ্যে রাশিয়ার তেল কেনা সংক্রান্ত শুল্কও রয়েছে—বিশ্ব বাণিজ্য প্রবাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ভারত এসব ব্যবস্থাকে ‘অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে এবং বলেছে, তাদের জ্বালানি নীতি জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত।
অভিজিৎ বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভারত এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারিনি কেন ট্রাম্প এতটা ভারতবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।’ তিনি উল্লেখ করেন, চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া অনেক দাবি পরে অস্বীকার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাঝে মাঝে দাবি করেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং একটি চুক্তি হবে। কিন্তু সেটা আদৌ সত্য কি না, তা স্পষ্ট নয়, কারণ পরে তা অস্বীকার করা হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্যাটা ঠিক কোথায়, বা দরকষাকষিতে এর প্রভাব কতটা—তা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।’
ইউরোপ কি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের বিকল্প হতে পারে—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, বাজারের আকার এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘ভারত বড় বাজার, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিশাল।’ তার পর্যবেক্ষণ, ইউরোপ বিলাসপণ্য ও যন্ত্রপাতিতে শক্তিশালী হলেও, যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘ইউরোপে বিলাসপণ্য ও যন্ত্রপাতির উৎপাদন বেশি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশাল বাজার। ভারত বড় বাজার হলেও তুলনীয় নয়। ফলে এই চুক্তি আমাদের কতটা ভূরাজনৈতিক সুবিধা দেবে, তা স্পষ্ট নয়। এখন ইউরোপ ও ভারত—দু’পক্ষই কিছুটা প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু করার চেষ্টা করছে এবং দেখছে কী হয়।’
এই এফটিএ কি বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সরবরাহ-শৃঙ্খল বিঘ্ন থেকে ভারতকে সুরক্ষা দিতে পারবে—এমন প্রশ্নে অভিজিৎ বলেন, সবকিছুই বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, ‘এটা পুরোপুরি নির্ভর করছে ভারত কতটা এর সুযোগ নিতে পারে তার ওপর।’ তিনি যোগ করেন, ‘শুল্ক হলো দামের একটি মাত্র অংশ। সরবরাহ-শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা, পরিবহন দক্ষতা ও সরবরাহের সময়সীমা—এই সবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবারও বলছি, এটা স্বয়ংক্রিয় নয়।’