উৎসব, আবেগ আর শিকড়ের টান; বর্ণাঢ্য আয়োজনে শেষ হলো ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা
উৎসব, আবেগ আর শিকড়ের টান; বর্ণাঢ্য আয়োজনে শেষ হলো ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা
editor
প্রকাশিত মে ২৯, ২০২৬, ১২:১৮ অপরাহ্ণ
Manual3 Ad Code
লন্ডন থেকে আজিজুল আম্বিয়া,
বৃহস্পতিবার (২৮ মে ২০২৬).
উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আয়োজন ‘৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬’ উৎসবমুখর ও বর্ণাঢ্য পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত ২২ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে চার দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, “যত বই তত প্রাণ”।
টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও প্রতিদিন ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। সমাপনী দিনে উজ্জ্বল রোদ আর প্রাণবন্ত পরিবেশে বই বিক্রি ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা যেন নতুনভাবে প্রকাশ পায় পুরো আয়োজনজুড়ে।
আবেগঘন সূচনা
মেলার প্রথম দিন শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ঢোলের বাদ্য ও সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে। ‘সংগীত সাধনা’র শিল্পীরা পরিবেশন করেন “আজি দখিন দুয়ার খোলা” ও “বাউলা কে বানাইলো রে”। পুরো প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আবহ।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তিন গুণী ব্যক্তিত্ব মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং তপন রায়চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন ইমদাদুল হক মিলন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও নজরুল ইসলামসহ বিশিষ্টজনেরা।
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও সম্মাননা
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন ফিতা কেটে বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মেলার ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রবেশপথে ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত মেলার ইতিহাস ও উদ্বোধকদের ছবি প্রদর্শন করা হয়।
Manual5 Ad Code
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন,
“গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আগামী ৩৫ বছরে তারা এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে।”
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।
সাহিত্য, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
চারদিনজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা পাঠ, সাহিত্য আড্ডা, সেমিনার, আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠান। ‘গদ্যের অন্দরমহল’, ‘কলম ও কৌতূহল’ এবং মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ক সেমিনার দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল “প্রবাস জীবন—বাঙালিকে দিয়েছে বাণিজ্যিকতা, কেড়ে নিয়েছে আন্তরিকতা” শীর্ষক বিতর্ক প্রতিযোগিতা। এছাড়া রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অদিতি মহসিনের একক সংগীতানুষ্ঠান ‘সীমার মাঝে অসীম’ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ
Manual5 Ad Code
তৃতীয় দিনটি ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের। বাংলা ভাষা, একুশে ফেব্রুয়ারি ও শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতায় বিপুল সংখ্যক শিশু-কিশোর অংশ নেয়।
সমাপনী দিনে “সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)” শীর্ষক আলোচনায় শতাধিক তরুণ অংশ নেয়। সেখানে প্রযুক্তি, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রাণবন্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
সাদাত হোসাইনকে ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাস
সমাপনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের সঙ্গে বিশেষ মুখোমুখি অনুষ্ঠান। বিশ্বজিত সাহার সঞ্চালনায় সাহিত্য, পাঠাভ্যাস ও সমকালীন সমাজ নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় পুরো অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
পুরস্কার ও প্রকাশকদের সন্তোষ
এবারের ‘মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬’ লাভ করেন ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও ঔপন্যাসিক ড. আবদুন নূর। অন্যদিকে ‘চিত্ত রঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার’ অর্জন করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বাতিঘর’।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ২৬টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবারের মেলায় অংশ নেয়। প্রকাশকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ দিনে গবেষণাধর্মী বই, উপন্যাস, স্মৃতিকথা ও শিশুতোষ বইয়ের রেকর্ড বিক্রি হয়েছে।
Manual8 Ad Code
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক বলেন,
“নিউ ইয়র্ক বইমেলা শুধু বইমেলা নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির আত্মিক মিলনমেলা।”
সমাপ্তি ও আগামী আয়োজন
Manual3 Ad Code
সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় চারদিনের এই আয়োজন। মেলা কমিটির আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম, চেয়ারপারসন ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিত সাহা সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
বিশ্বজিত সাহা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“নিউ ইয়র্ক বইমেলা আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির এক যৌবনের অহংকার।”
সমাপনী মঞ্চ থেকেই ঘোষণা দেওয়া হয়, আগামী বছরের ৩৬তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২১ থেকে ২৪ মে ২০২৭ পর্যন্ত।