যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা এসপিআর) দ্রুত কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় মজুত তেল ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে তেলের দাম ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।
Manual3 Ad Code
গত ২৮ মে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, জো বাইডেন প্রশাসন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতীয় তেলভান্ডার খালি করছে। কিন্তু বর্তমানে ইরানকে ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনও ব্যাপক হারে সেই মজুত থেকে তেল ছাড়ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এসপিআরে থাকা তেলের পরিমাণ কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। সেই ঘাটতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার জরুরি মজুত ব্যবহার করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রধান তেল বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, এই মজুত একসময় পুনরায় পূরণ করতে হবে। ফলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, যা তেলের দামের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর কমেছে ৫ কোটি ব্যারেল
টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ গুহায় সংরক্ষিত এসপিআর বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেলের ভান্ডার। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে এই মজুত ব্যবহার করা হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ে। তখন মজুত ৬৩ কোটি ব্যারেলের বেশি থেকে কমে ৩৫ কোটির নিচে নেমে আসে।
Manual4 Ad Code
বর্তমান সংকটে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আবারও মজুত থেকে তেল ছাড়তে হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে এসপিআরের মজুত প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল কমে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে এসপিআর থেকে ছাড়া তেলের প্রায় অর্ধেক বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
ম্যাট স্মিথের ভাষায়, বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করছে।
বাণিজ্যিক মজুতও কমছে
শুধু জরুরি মজুত নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেলভান্ডারও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ওকলাহোমার কুশিং কেন্দ্র, যেখান থেকে ডব্লিউটিআই তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়, সেখানে মজুতের পরিমাণ সাত সপ্তাহে প্রায় ৮৫ লাখ ব্যারেল কমেছে।
বর্তমানে কুশিংয়ে মজুত নেমে এসেছে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেলে, যা কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে সংরক্ষণ ট্যাংকগুলোর মজুত বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আলোচনা
Manual4 Ad Code
জরুরি ও বাণিজ্যিক উভয় ধরনের মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তেল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আপাতত এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করলে যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িকভাবে জ্বালানির দাম কমতে পারে। তবে এতে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বাড়বে এবং মার্কিন তেল উৎপাদক ও শোধনাগারগুলোও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ম্যাট স্মিথের মতে, মজুত কমতে থাকলে বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি কমে আসতে পারে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, যদি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত তেল সরবরাহের সক্ষমতা হারায়, তাহলে বিশ্ববাজারের দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল কোথা থেকে সংগ্রহ করবে?