আজ শুক্রবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীমান্তে ফের ‘পুশ-ইন’ উত্তেজনা: কঠোর অবস্থানে বিজিবি

editor
প্রকাশিত জুন ১, ২০২৬, ১০:২৮ অপরাহ্ণ
সীমান্তে ফের ‘পুশ-ইন’ উত্তেজনা: কঠোর অবস্থানে বিজিবি

Manual6 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ এখন শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি ক্রমেই মানবাধিকার, নাগরিকত্ব ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে। গত এক মাসে একাধিক সীমান্ত দিয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের ধারাবাহিকতায় এবার বেনাপোল সীমান্তে ১০ জনকে নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

Manual8 Ad Code

সর্বশেষ যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় রবিবার (৩১ মে) দিবাগত গভীর রাতে তারকাটার বেড়ার গেট খুলে ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বিজিবি বিষয়টি জানতে পেরে ওই পুশ-ইন প্রতিহত করলে তারা বর্তমানে বেনাপোল সীমান্তের সাদিপুর গ্রামের বোম্বেতলা সংলগ্ন জিরো লাইনে (নোম্যান্স ল্যান্ড) অবস্থান করছেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও সাড়া দেয়নি।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার স্বীকৃত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে গত এক মাসে আবারও ভারতের বিএসএফের বিরুদ্ধে অবৈধ প্রক্রিয়ায় পুশ-ইনের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) জানিয়েছে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ও চেকপোস্টভিত্তিক আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। ফলে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড বা জিরো লাইনে আটকে পড়েছে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বেশ কয়েকজন।

যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বিএসএফের মাধ্যমে সীমান্তে নিয়ে আসা ১০ জন এখনও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থান করছে। বিষয়টি সমাধানে বিএসএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

Manual4 Ad Code

এক মাসে একাধিক সীমান্তে পুশ-ইনের অভিযোগ

মে মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ পরিচয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। যদিও মে মাসে মোট কতজনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়েছে বা কতজনকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—সে বিষয়ে বিজিবি বা সংশ্লিষ্ট কোনও সরকারি সংস্থা এখন পর্যন্ত সমন্বিত পরিসংখ্যান বা সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেনি।

ঈদুল আজহার আগে ২৪ মে থেকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্তে শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানিয়েছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সেসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

এর আগে ২৭ মে সাতক্ষীরার কুশখালি সীমান্ত দিয়ে ২৩ জনকে পুশ-ইনের অভিযোগ ওঠে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে ধলই সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুপ্রবেশের অভিযোগে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়।

মে মাসের শেষদিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টাকালে ১০ জনকে আটক করে বিজিবি। এছাড়া মেহেরপুর, যশোর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায়ও একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

সীমান্তে নজরদারি জোরদার

ক্রমবর্ধমান পুশ-ইন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি। অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

Manual7 Ad Code

বিজিবি সদর দফতরের উপ-মহাপরিচালক (ডিডিজি) ও বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অবৈধভাবে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কাউকে বিজিবি গ্রহণ করবে না। কোনও ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করা হলে আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে নির্ধারিত চেকপোস্টের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘সীমান্তে উদ্ভূত যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে। পুশ-ইনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঈদ উপলক্ষে দায়িত্বে থাকা অনেক সদস্যের ছুটিও সীমিত করা হয়েছিল।’’

মানবাধিকার ও কূটনৈতিক প্রশ্ন

ভারত থেকে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটনাগুলোর সংখ্যা এবং বিস্তৃতি বাড়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

Manual6 Ad Code

মানবাধিকারকর্মী ও সীমান্ত বিশ্লেষকদের মতে, কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিশ্চিত না করে তাকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও স্বীকৃত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে সীমান্ত এলাকায় মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও অস্বস্তি বাড়তে পারে।
সুএ:বাংলা ট্রিবিউন