আজ শুক্রবার, ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লির বার্তা ও আচরণে বৈপরীত্য

editor
প্রকাশিত জুন ১৬, ২০২৬, ১০:৩৭ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লির বার্তা ও আচরণে বৈপরীত্য

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

Manual2 Ad Code

বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বক্তব্য এবং কূটনৈতিক বার্তার সঙ্গে তাদের বাস্তব আচরণের প্রায়শই অমিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা অনেকেই নয়াদিল্লির মনোভাবকে বন্ধুভাবাপন্ন নয় বলে মনে করছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।

Manual8 Ad Code

ভারতীয় কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করেছেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করবে। গত বছরের ৬ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দলকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছিলেন, “ভারত বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। নির্বাচনে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে ভারত কাজ করতে প্রস্তুত।”

গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও ভারতের আনুষ্ঠানিক বার্তাগুলো আন্তরিকই ছিল। তবে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সবসময় সেই সুরের প্রতিফলন ঘটায়নি।

ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণার সময় বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক বক্তব্য তীব্রতর হয়। এর পাশাপাশি সমালোচকেরা সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা এবং অন্যান্য ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করছেন, যা ঢাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সবশেষ বিতর্কটি তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে নিয়ে, যিনি নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

‘আমি হেনস্থার শিকার হয়েছি’: জাহেদ

গত রোববার ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ডা. জাহেদকে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বসিয়ে রাখার পর অবশেষে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে উপদেষ্টা বলেন, “আমার সঙ্গে যা ঘটেছে, আমি একে হেনস্থাই বলব।”

উপদেষ্টা জাহেদ এ সময় বলেন, বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে এবং এই স্বার্থের সঙ্গে আপস করে কোনো দেশের সঙ্গে যুক্ত হবে না।

হেনস্থার জবাবে বাংলাদেশ কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি মূল্যায়ন করছে এবং তারাই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে।

Manual5 Ad Code

এ ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহেদ বলেন, কেন তাকে আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল তা তিনি জানেন না।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রশাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

তিনি বলেন, “আমি জানি না তারা কেন এমন আচরণ করল।”

এই তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও জাহেদ আশা প্রকাশ করেন, ঘটনাটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি করবে না। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আমন্ত্রণ জানালে তিনি আবারও ভারত সফরে যেতে রাজি আছেন।

ভারত-বিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার ঝুঁকি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে, ভারত বিএনপির সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে যোগ দিতে ঢাকা সফর করেছিলেন। অন্যদিকে নির্বাচনের পর নতুন বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।

Manual3 Ad Code

এই পদক্ষেপগুলোকে অনেকেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখেছিলেন।

তবে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বার্তার সঙ্গে তাদের আচরণের সবসময় মিল ছিল না। তারা সাম্প্রতিক সীমান্ত-সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার প্রতি আচরণের মতো ঘটনাগুলোকে সামনে আনছেন, যা সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে যখন ভারতকে নিয়ে জনসাধারণের ধারণা বেশ সংবেদনশীল।

এটি সবার জানা যে, নয়াদিল্লির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। সরকার পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও জানা গেছে, বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, একটি সুস্থ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাদের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক স্বার্থ একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করার প্রচেষ্টায় কোনো সাহায্য করবে বলে মনে হয় না। কূটনীতিকদের মতে, ভুল বোঝাবুঝি রোধ এবং দুই প্রতিবেশীর মধ্যে পুনরায় আস্থা তৈরির জন্য বাস্তববাদিতা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক যোগাযোগই এখন সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তথ্য সুএঃ বাংলাদেশ টাইমস