বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্বের নাম অম্লান হয়ে থাকে, যাদের জীবন সংগ্রাম, আদর্শ ও দেশের প্রতি অঙ্গীকার জাতির স্মৃতিতে চিরকাল অঙ্কিত থাকে। তেমনই একজন ছিলেন অলি আহাদ। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর সেনানী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ অলি আহাদ।
Manual2 Ad Code
রুমিন ফারহানা, অলি আহাদের কন্যা। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার রাজনৈতিক জীবনের সাক্ষী। একসময় স্বচক্ষে দেখেছিলেন তার বাবা কিভাবে রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন এবং সেইসাথে জনগণের অধিকার রক্ষায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। রুমিন ফারহানা, যিনি একজন ব্যারিস্টার ও বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য।
তবে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুধুমাত্র বাবার রাজনৈতিক আদর্শকেই অনুসরণ করা নয়, বরং সেই অটল শক্তির প্রতিফলন, যা তিনি ছোটবেলা থেকে নিজের পরিবারে দেখে আসছিলেন। ২০২২ সালে যুগান্তরকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন আমি বাবার একমাত্র সন্তান। আমি আমার বাবাকে যেদিন হারাই সেদিন মনে হয়েছে আমি পৃথিবীর সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি।
অলি আহাদ ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল ওহাব ছিলেন একজন শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই অলি আহাদ শিক্ষা ও রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তিনি ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৪৮ সালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
Manual2 Ad Code
অলি আহাদ
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অলি আহাদ রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। তার এই সাহসী ভূমিকা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অমূল্য অবদান রাখে।
Manual8 Ad Code
অলি আহাদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার অবদানের পরেও রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে থাকেন। তিনি ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে মাওলানা ভাসানীর সাথে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরণের পক্ষাবলম্বন করেন। তিনি রাজনীতি করেছেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। তার নেতৃত্বের গুণাবলি এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তা তাকে রাজনীতির এক অনন্য শীর্ষে নিয়ে যায়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অলি আহাদ সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন, কিন্তু নীতির প্রশ্নে আপস না করে পরে বিচ্ছিন্ন হন। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মাওলানা ভাসানীর সাথে যুক্ত হয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিতে অংশ নেন। পরবর্তীকালে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হয়।
Manual2 Ad Code
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার লড়াই অব্যাহত ছিল। এরশাদ আমলে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন এবং তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণতন্ত্র, প্রেসের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তার সংগ্রাম ছিল অটুট। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনি তার রচিত বই “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫” এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল রেখে গেছেন।
অলি আহাদের স্ত্রী ছিলেন প্রফেসর রশিদা বেগম। তাদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়।