আজ বৃহস্পতিবার, ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন; মেসির সাথে প্রতারণা, কৌশলগত ভুলেই শিরোপা হারাল আর্জেন্টিনা

editor
প্রকাশিত জুলাই ২০, ২০২৬, ০৯:৩১ অপরাহ্ণ
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন; মেসির সাথে প্রতারণা, কৌশলগত ভুলেই শিরোপা হারাল আর্জেন্টিনা

Manual6 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের উচ্ছ্বাসে যখন মেতে উঠেছিল ফুটবল বিশ্ব, ঠিক তখনই বিপরীত এক দৃশ্য ধরা পড়ে লিওনেল মেসির মুখে। গ্যালারি থেকে হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক তার নাম ধরে গান গাইলেও ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তিকে দেখা যায় নীরব, বিষণ্ন ও আবেগাক্রান্ত। অনেকের কাছেই এটি ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির সম্ভাব্য শেষ উপস্থিতির প্রতীকী মুহূর্ত।

Manual8 Ad Code

নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল শেষে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। সংবাদ সম্মেলনে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে এখনো অধিনায়কের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। কথা বলতে বলতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্কালোনি এবং একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে যান।

Manual6 Ad Code

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বয়সের সঙ্গে নিজের খেলায় একাধিকবার পরিবর্তন এনে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন মেসি। ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনায় অভিষেকের পর অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলে নতুন ভূমিকায় মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির বর্তমান মেসি সেই বিবর্তনেরই পরিণত রূপ। ৩৯ বছর বয়সেও এবারের বিশ্বকাপে তার পায়ের জাদু ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। তবে ফাইনালে সেই জাদু আর দেখা যায়নি। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ও শারীরিক লড়াইনির্ভর কৌশল বেছে নেয় আর্জেন্টিনা, যা উল্টো দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র মেসিকেই কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ম্যাচজুড়ে তিনি খুব কমই নিজের স্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন।

ভুল কৌশলে খেলা

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও মারমুখী মনোভাব মেসির খেলায় কোনো সাহায্য তো করেইনি, বরং উল্টো ওই কৌশল আর্জেন্টিনা দলের প্রধান অনুপ্রেরণা ও দলনেতাকে ম্যাচের বেশিরভাগ সময় কার্যত একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক বানিয়ে রেখেছিল।

পুরো ম্যাচে স্পেন ছিল ছন্দময় ও নিয়ন্ত্রিত, আর আর্জেন্টিনা বারবার জড়িয়ে পড়ে ফাউল ও উত্তেজনায়। ম্যাচের শুরুতেই দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কঠিন ফাউলের পরও কঠোর শাস্তি না দেওয়ায় রেফারিং নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। গ্যালারি থেকে স্পেনের সমর্থকেরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানও দেন। টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা রেফারিংয়ে সুবিধা পেয়েছে—এমন অভিযোগেরও প্রতিফলন দেখা যায় সেই প্রতিক্রিয়ায়।

কারণ পুরো ম্যাচ জুড়ে আর্জেন্টিনার পুরো মনোযোগ ফুটবল বাদে অন্য সবকিছুর দিকেই ছিল বলে মনে হচ্ছিল। ম্যাচের শুরুর দিকে স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিনসিক এমন শিথিলতা দেখান, যা পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই প্রতিপক্ষ দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে। দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের এক মারাত্মক ফাউলের পরও তাকে কেবল মৃদু সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে স্পেনের সমর্থকেরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে শুরু করেন।

এটি ছিল মূলত সেইসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে টুর্নামেন্টের কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বের কারণেই আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ এত সহজ হয়েছে।

খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক আচরণ

ম্যাচের শেষভাগে আর্জেন্টিনার হতাশা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এনজো ফার্নান্দেজের অপ্রয়োজনীয় আক্রমণাত্মক আচরণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখার ঘটনা এবং শেষ বাঁশির পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি ফাইনালের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান করে দেয়। বদলি খেলোয়াড় লেয়ান্দ্রো পারেদেসও একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

৯০ মিনিটে কোনো শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা

Manual7 Ad Code

পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পারফরম্যান্সের সাক্ষ্য দেয়। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটি শটও নিতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। পুরো ম্যাচে স্পেনের অন টার্গেট শট ছিল ১২টি, বিপরীতে আর্জেন্টিনার ছিল শূন্য। অতিরিক্ত সময়ের ১১৭তম মিনিটে মেসি একটি সুযোগ পেলেও তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

Manual3 Ad Code

প্রথমার্ধেই প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে আর্জেন্টিনা যতটি পাস দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ফাউল করেছে—শেষ তৃতীয়াংশে তাদের পাস ছিল আটটি, আর ফাউল ছিল নয়টি। এই পরিসংখ্যানই ম্যাচে তাদের পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে।

ফাইনালের শেষ বাঁশির পর সতীর্থদের সঙ্গে চোখের জল ভাগ করে নেন মেসি। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার ৩৪তম ম্যাচ। তাই অনেকের ধারণা, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এটাই হয়তো ছিল আর্জেন্টাইন মহাতারকার শেষ অধ্যায়।

শিরোপা দিয়ে বিদায় নেওয়া হয়নি, কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে নিজের অসাধারণ প্রভাব, অসংখ্য রেকর্ড এবং অনন্য শিল্পময় ফুটবলের জন্য লিওনেল মেসি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।