একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, কোয়ালিশন সরকার, ক্ষমতা হস্তান্তর – এগুলো কীভাবে হয়
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, কোয়ালিশন সরকার, ক্ষমতা হস্তান্তর – এগুলো কীভাবে হয়
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ণ
Manual1 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে, কোনো দল একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে নাকি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে, ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে- এসব নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
একই সাথে আলোচনায় আছে নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষের গঠন করা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া কী- তা নিয়েও।
এবার সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে তিনশ সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি। ওই দিন একই সাথে ভোটাররা গণভোটেও অংশ নিচ্ছেন।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ।
ফলে দৃশ্যত এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে।
Manual3 Ad Code
ফলে নির্বাচনে কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসতে পারে কি-না তা নিয়ে যেমন কৌতূহল আছে, তেমনি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার মতো তৈরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি-না সেদিকেও দৃষ্টি আছে অনেকের।
কিন্তু এই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, কোয়ালিশন সরকার, ক্ষমতা হস্তান্তর কিংবা সরকার গঠন- এগুলো কী কিংবা এসব কীভাবে হয়?
একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য একটি দলকে অর্ধেকের বেশি আসন পেতে হয়
একক/নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
Manual8 Ad Code
সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলছেন, সংসদের মোট আসনের অর্ধেক+১টি কিংবা এর চেয়ে বেশি আসনে বিজয়ী হলেই তাকে একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলা হয়।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য কোন দল বা জোটকে কমপক্ষে ১৫১টি আসন পেতে হবে। আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সের মোট আসন ৬৫০ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য পেতে হয় ৩২৬ আসন। ভারতে লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে কোনো দলকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পেতে হরে ২৭২ আসন পেতে হয়।
রাষ্ট্রপতি একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের প্রধানকেই সাধারণত সরকার গঠনের আহবান জানিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে কোনো দল এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বেশি আসনে জয়ী দলকে তখন সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন যোগাড় করতে হয়। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার আছে এমন সব দেশের জন্যই এটি প্রযোজ্য,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি এবং ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বেশি আসনে জিতলেও একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে অন্যদের সমর্থন নিয়ে দল দুটিকে তখন সরকার গঠন করতে হয়েছিল।
নিজাম উদ্দিন আহমেদ অবশ্য বলছেন, অনেক সময় একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলকে সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির আহবান জানানোর উদাহরণ অনেক দেশেই আছে।
“সেক্ষেত্রে সরকার গঠনের পর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হয়,” বলছিলেন মি. আহমেদ।
ভারতে ১৯৯৬ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বেশি আসন জিতেছিল বিজেপি। এরপর প্রথম বিজেপি নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। কিন্তু শপথ গ্রহণের তের দিনের মাথায় লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারায় তার সেই সরকারের পতন হয়েছিল।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রপতি
ঝুলন্ত পার্লামেন্ট কী
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলছেন, সাধারণত নির্বাচনে কোনো সংসদে যদি কোনো একক দল বা জোট হিসেবে সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, সেই পরিস্থিতিটাই ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চালু আছে এমন দেশে এক্ষেত্রে সরকার গঠন করার জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট বা সমঝোতা প্রয়োজন হয়।
তার মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ভারতের লোকসভাসহ বহু দেশে এমন পরিস্থিতি অনেকবার হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হলো যখন কোনো একক দল হাউজ অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। এটা এমন একটা পরিস্থিতি হিসেবে পরিচিত যেখানে কারও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নেই।
যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিককালে ২০১৭ সালে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হয়েছিল।
ওই নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি বেশি সংখ্যক আসন জিতেছিল কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া পরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের দল ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টিকে আস্থায় নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন টেরিজা মে।
এর আগে ২০১০ সালের নির্বাচনেও ডেভিড ক্যামেরন লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সাথে মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিলেন। ক্যামেরনের দল কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ২০টি আসন কম জিতেছিল নির্বাচনে। পরে তাদের জোট ৫ বছর মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল।
ভারতে সাম্প্রতিককালে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরেও ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হয়েছে। এই নির্বাচনে বিজেপি জিতলেও সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি । পরে কয়েকটি দলের সমর্থন নিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করেছিল।
কোয়ালিশন সরকার
Manual5 Ad Code
ঝুলন্ত পার্লামেন্ট আর কোয়ালিশন সরকার পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত বলে বলছেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, সংসদে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হলে একাধিক দল মিলে যে সরকার গঠন করে সেটাকেই কোয়ালিশন সরকার বলা হয়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তুলনামূলক বেশি আসন পাওয়া দলকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
“ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হলে বা কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বেশি আসন পাওয়া দল কম আসন পাওয়া এক বা একাধিক দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে দেখা যায়। এ ধরনের সরকারকে কোয়ালিশন সরকার বলে। বিশ্বজুড়ে এমন সরকারের বহু উদাহরণ আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
নির্বাচনের পরেও যেমন সরকার গঠনের জন্য কোয়ালিশন হতে পারে, তেমনি নির্বাচনের আগে থেকেও কয়েকটি দল মিলে জোট করে একসাথে নির্বাচন করে জিতলে একসাথে সরকারও গঠন করতে পারে। বাংলাদেশে ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।
যুক্তরাজ্যে ২০১০ সালের নির্বাচনের পর ডেভিড ক্যামেরনের কনজারভেটিভ পার্টি ও নিক ক্লেগের লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এ ধরনের সরকার করেছিল।
মি. আহমেদ বলছেন, অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য সমর্থন দেওয়া ছোটো ছোটো দলের চাপের মুখে থাকতে হয় বড় দলগুলোকে। “এমনকি অনেক সময় ছোটো দলের সমর্থন প্রত্যাহারের কারণে সরকার পতনেরও অনেক নজির আছে”।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানে ২০২২ সালে কোয়ালিশন সরকারের মিত্র দলগুলো সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সংসদে বিরোধী দলগুলোর আনা অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পরে ইমরানের ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়া দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন শাহবাজ শরিফ।
দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলছেন, সরকার গঠনের জন্য একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
অর্থাৎ সংসদের মোট আসন সংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ কোনো দল বা জোট পেলে সেটিই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হিসেবে পরিচিত।
“সাধারণত অনেক দেশে সংসদে সংবিধান পরিবর্তন, জরুরি কোনো আইন পাস কিংবা বিশেষ প্রস্তাব পাসের জন্য দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের সংবিধানও পরিবর্তনের জন্য এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান এখন পর্যন্ত বিদ্যমান সংবিধানে আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. আহমেদ।
দৃশ্যত এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে।
ক্ষমতা হস্তান্তর ও নতুন সরকার গঠন
নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বা জোটের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আহবান জানান রাষ্ট্রপতি।
নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলছেন, নতুন সরকারের শপথের মধ্য দিয়েই পুরনো সরকারের বিদায় ঘটে এবং এটাকেই ক্ষমতা হস্তান্তর বলা হয়।
বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের উদাহরণ খুবই কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আন্দোলন বা সংঘাতের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে।
“গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বিদায়ী সরকার প্রধান বা তার প্রতিনিধিরা থাকেন। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমাদের দেশে এমনটা বিরল,” বলছিলেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।
নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এর মাধ্যমে সংসদ গঠিত হয়।
এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোট সংসদ নেতা নির্বাচন করার পর তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
এরপর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়।
“এর মধ্য দিয়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে এবার অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় সেটি এখনো পরিষ্কার নয়,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সংসদ বিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।
মি. আহমেদ এও বলছেন যে, অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাকে সরকার গঠনের আহবান জানান রাষ্ট্রপতি। “সেক্ষেত্রে তিনি এই শর্ত দেন যে সরকার গঠনের পর সংসদে তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে,” বলছিলেন তিনি।