রাজনীতিতে ডিম ছোড়ার রীতি এলো কীভাবে? বাংলাদেশের আইনে যা আছে
রাজনীতিতে ডিম ছোড়ার রীতি এলো কীভাবে? বাংলাদেশের আইনে যা আছে
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০২:০০ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
কাউকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারা হঠকারী আচরণ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে এটি কেবল ক্ষোভ প্রকাশের ভাষাই নয়, বরং প্রতীকী অপমান ও প্রতিবাদের এক বিশেষ ভাষা।
ডিম ছোড়ার ইতিহাস
প্রাচীন গ্রিস ও রোমে জনসমক্ষে অপমানের ধারণাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপছন্দের শাসক, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা বা সমাজবিরোধী ব্যক্তিকে হেয় করতে কখনো কখনো পচা ফল, সবজি কিংবা ডিম নিক্ষেপ করা হতো। শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং সম্মানহানি ও সামাজিক লজ্জাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে রোমান গভর্নর ভেসপাসিয়ান তার কর নীতির কারণে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন এবং তাকে লক্ষ্য করে শালগম ছোড়া হয়েছিল।
ডিমের ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট লিখিত রেকর্ড পাওয়া যায় এশিয়া মাইনরের কবি হিপোনাক্সের সময়ে (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী)। তিনি লিখেছিলেন যে, সমাজচ্যুত বা অপরাধীদের ওপর ডিম বা পচা খাবার ছুড়ে মেরে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হতো।
এলিজাবেথান যুগে (শেক্সপিয়রের সময়) দর্শকরা যখন কোনো অভিনেতার অভিনয় অপছন্দ করত, তখন তারা পচা ডিম ছুড়ে মারত।
বিখ্যাত লেখিকা জর্জ এলিয়ট তার ১৮৩০-এর দশকের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘মিডলমার্চ’ উপন্যাসেও নির্বাচনে ডিম ছোড়ার দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। এর অর্থ হলো ওই সময়েও এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হয়ে উঠেছিল।
Manual2 Ad Code
মধ্যযুগে ইউরোপে ‘চারিভারি’ নামে পরিচিত এক ধরনের গণ-উপহাসের রীতি প্রচলিত ছিল। সমাজ যাকে অনৈতিক বা গ্রহণযোগ্য মনে করত না (যেমন—অনিচ্ছাকৃত বিয়ে, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সামাজিক নিয়ম ভাঙা কেউ), তাদের বাড়ির সামনে গিয়ে জনতা হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই বা ড্রাম পিটিয়ে বিকট ও কর্কশ শব্দ করতো।
Manual1 Ad Code
এই বিশৃঙ্খল শব্দের মাধ্যমে মূলত ওই ব্যক্তিকে জনসমক্ষে লজ্জা দেওয়া এবং অপমান করা হতো। অনেক সময় এই হট্টগোলের মাঝেই পচা ডিম বা ময়লা ছোড়া হতো। এটি ছিল এক অর্থে ‘মব জাস্টিস’।
মধ্যযুগে যখন কোনো অপরাধীকে কাঠের ফ্রেমে হাত-পা আটকে রাখা হতো (পিলরি), তখন সাধারণ মানুষ তাদের ওপর পচা ডিম ছুড়ে মারত। এটিই মূলত আধুনিক ‘এগিং’-এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল।
আধুনিক যুগে ডিম ছোড়া একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা। ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের ওপর ডিম ছোড়ার ঘটনাটি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ‘এগিং’ ইনসিডেন্ট।
এছাড়া, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ১৯৯০ সালের নির্বাচনে এবং তারও আগে লেবার পার্টি ও ছাত্র আন্দোলনের সময় ডিম হামলার শিকার হয়েছিলেন।
১৯৯২ সালের মে মাসে সাউদাম্পটনে একটি নির্বাচনী প্রচারণার সময় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের মুখে সরাসরি একটি ডিম এসে লাগে।
রাজপরিবারের সদস্য হয়েও রাজা তৃতীয় চার্লস একাধিকবার এই বিড়ম্বনায় পড়েছেন। রাজা হওয়ার পর চার্লস এবং কুইন কনসোর্ট ক্যামিলা যখন ইয়র্কের ঐতিহাসিক ‘মিকলগেট বার’ দিয়ে শহরে প্রবেশ করছিলেন, তখন ২৩ বছর বয়সী এক যুবক তাদের লক্ষ্য করে ৫টি ডিম ছোড়ে। ডিমগুলো রাজার খুব কাছ দিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়েছিল। ওই যুবক চিৎকার করে বলছিলেন, ‘এই দেশ দাসের রক্ত দিয়ে গড়া’।
ইয়র্কশায়ারের ঘটনার ঠিক এক মাস পর, ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর আবারও লুটন টাউন হলের সামনে জনসাধারণের সাথে হাত মেলানোর সময় ২১ বছর বয়সী এক তরুণ রাজাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ে।
লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটে টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছিল হাজার হাজার ছাত্র। সে সময় প্রিন্স চার্লস ও ক্যামিলার রাজকীয় গাড়িটি বিক্ষোভকারীদের মুখে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা গাড়িতে ডিম ছুড়ে মারে, লাথি দেয় এবং সাদা রং ছিটিয়ে দেয়। গাড়ির একটি জানালাও ভেঙে গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে আর্নল্ড শোয়িার্জনেগারের ওপর ডিম ছোড়া হয়েছিল। ওই সময় তিনি রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ ‘রিকল’ নির্বাচনে লড়ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনীতিবিদদের দিকে ডিম ছোড়া হয়।
জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ায় বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেও এমন ঘটনার নজির আছে।
Manual3 Ad Code
এসব ঘটনায় ডিম ছোড়া ছিল এক ধরনের বার্তা দেওয়া। যেমন, আমরা তোমার ক্ষমতা মানছি না, তোমাকে সম্মানও দিচ্ছি না।
কেন ডিমই বেছে নেওয়া হয়?
ডিম ছোড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও ব্যবহারিক কারণ আছে। প্রথমত, এটি মারধরের মতো গুরুতর সহিংসতা না। এটি গায়ে লাগলে শারীরিক ক্ষতি হয় না, কিন্তু ডিমের দুর্গন্ধ এবং আঠালো ভাব ভুক্তভোগীর আত্মমর্যাদাকে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেয়।
তাছাড়া এটি প্রায় সবখানেই সস্তায় পাওয়া যায়।
এসব কারণে সমাজবিজ্ঞানীরা ডিম ছোড়াকে প্রায়ই ‘প্রতীকী সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করেন। এখানে আঘাতের চেয়ে অপমানটাই মুখ্য।
রাজনীতিতে ডিম ছোড়ার রীতি এলো কীভাবে? বাংলাদেশের আইনে যা আছে
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৩৫২ অনুযায়ী, যে ব্যক্তি গুরুতর ও তাৎক্ষণিক উসকানি ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করে অথবা তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, সে ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড (যে কোনো প্রকারের), অথবা সর্বোচ্চ পাঁচশ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এই ধারা অনুযায়ী যদি ডিম ছোড়াকে ‘অ্যাসল্ট’ বা ‘ক্রিমিনাল ফোর্স’ (অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ) হিসেবে গণ্য হতে পারে।
দণ্ডবিধির ৩৩৪ ধারা বলছে, যে ব্যক্তি গুরুতর ও তাৎক্ষণিক উসকানির প্রেক্ষিতে স্বেচ্ছায় আঘাত করে, যদি সে নিজে অন্য কোনো ব্যক্তিকে আহত করার উদ্দেশ্য না রাখে এবং জানে না যে অন্য কেউ আহত হওয়ার সম্ভবনা আছে, তবে সে ব্যক্তির দণ্ডের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড (যে কোনো প্রকারের), অথবা সর্বোচ্চ পাঁচশ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
৩২৩ ধারা বলছে, যে ব্যক্তি, ধারা ৩৩৪–এ বর্ণিত ক্ষেত্র ব্যতীত, স্বেচ্ছায় আঘাত ঘটায়, সে ব্যক্তির দণ্ডের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড (যে কোনো প্রকারের), অথবা সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ডিম ছোড়ার ফলে যদি আঘাত লাগে, তাহলে এই শাস্তিগুলো হতে পারে।
দণ্ডবিধির ৫০৪ ধারা অনুযায়ী, যদি প্রমাণ হয় যে ডিম ছোড়ার উদ্দেশ্য ছিল প্রকাশ্য অপমান করা এবং এতে শান্তি ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা ছিল বা জনসমক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তাহলে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
দণ্ডবিধির ২৯০ ধারা অনুযায়ী, ‘পাবলিক নুইসেন্স’, মানে সাধারণ জনগণের জন্য বিরক্তি বা অসুবিধা সৃষ্টিকারী কাজ অপরাধ। এ হিসেবে ডিম ছোড়া পাবলিক নুইসেন্স বলে গণ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুইশ টাকা জরিমানা হবে।
ডিম ছোড়ার মাধ্যমে যদি ভুক্তভোগীর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, তবে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানির মামলাও হওয়ার সুযোগ থাকে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড।