টোল বুথ;’ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন শর্ত ইরানের
টোল বুথ;’ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন শর্ত ইরানের
editor
প্রকাশিত মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৫:২৯ অপরাহ্ণ
Manual2 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
Manual6 Ad Code
ইরানের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের জবাবে ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা নিয়ে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে সরবরাহকৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। সংঘাত শুরুর আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল। তবে ইরানে আগ্রাসনের পর প্রণালিটি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সংকীর্ণ এই প্রণালির দুই পাশে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানি গণমাধ্যম জানায়, প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের জন্য আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট।
তাসনিম ও ফার্স সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানের বরাতে একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগিরই ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির আইন বিভাগ তা চূড়ান্ত করবে।
Manual5 Ad Code
ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ফি আদায় করা হবে। তার ভাষায়, “এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। অন্যান্য করিডরে যেমন পণ্য পরিবহনের সময় শুল্ক দিতে হয়, হরমুজ প্রণালিও তেমন একটি করিডর। আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, তাই জাহাজ ও ট্যাংকারগুলোর শুল্ক দেওয়া স্বাভাবিক।”
তবে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই গত দুই সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি টোল ব্যবস্থা চালু করেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থা লয়েডস লিস্ট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করে। এর পরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও এলএনজি বহনকারী মার্কিন ও ইসরাইলি জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরানের আইআরজিসি।
এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
প্রণালিটি উপসাগরীয় অধিকাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানির একমাত্র পথ হওয়ায় বিভিন্ন দেশ ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করেছে।
গত রোববার ইরানের সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি জানান, কিছু জাহাজ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “যুদ্ধের খরচ রয়েছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ফি নিতে হচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ প্রণালির দুই পাশে অপেক্ষা করছে। মেরিটাইম গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, অনেক জাহাজ দীর্ঘ বিকল্প পথ নেওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষা করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছে।
১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহে মাত্র ১৬টি জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু রেখে প্রণালি অতিক্রম করেছে। একই সময়ে আরও চারটি কার্গো জাহাজ পার হয়েছে।
আইন পাস না হলেও গত দুই সপ্তাহে ২৬টি জাহাজ আইআরজিসির অনুমোদিত রুট ব্যবহার করে চলাচল করেছে। এ ক্ষেত্রে জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসি-সংযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাহাজের প্রয়োজনীয় তথ্য—যেমন নথি, আইএমও নম্বর, মালামাল, ক্রুদের নাম ও গন্তব্য—জমা দিতে হয়।
পরবর্তীতে আইআরজিসি নৌবাহিনী যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিলে একটি বিশেষ কোড প্রদান করে এবং নির্দিষ্ট রুট নির্দেশনা দেয়। প্রণালিতে প্রবেশের পর রেডিওর মাধ্যমে ওই কোড যাচাই করা হয়। অনুমোদন পেলে ইরানি নৌবাহিনী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নেয়। অনুমতি না থাকলে কোনো জাহাজকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
Manual1 Ad Code
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলোর জাহাজ ছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজ শর্তসাপেক্ষে চলাচল করতে পারবে। ইতোমধ্যে চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, মিশর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
কিছু জাহাজ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ফি পরিশোধ করেছে বলেও জানা গেছে, যদিও সুনির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ভারত দাবি করেছে, তাদের জাহাজ কোনো ফি দেয়নি।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনের বিধান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং তা স্থগিত করা যায় না। তবে ইরান দাবি করছে, তারা এই আইনে বাধ্য নয়, কারণ তারা এটি অনুমোদন করেনি।
Manual8 Ad Code
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালিটি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ইরান ও ওমানের জলসীমা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আল-জাবের এই পদক্ষেপকে “অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ইরান যখন হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে, তখন এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে—জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের দামে।”