“মনে হচ্ছে তারা খুব সুকৌশলে কালেমার নামে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের নৈতিক সমর্থন পেতে চাইছেন,” বলেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা।
সাদা কিংবা কালো কাপড়ের জমিনে কলেমা তায়্যিবা খচিত পতাকা গত এক সপ্তাহ ধরে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।
যারা পতাকা ছড়াচ্ছেন বা পতাকা হাতে মিছিল করছেন, তাদের যুক্তি, দেশে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়াতে পারলে ‘কলেমার পতাকায়’ সমস্যা কোথায়?
আবার ভূ-রাজনীতি নিয়ে সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, এই পতাকা দেখিয়েই বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে কোনো মহল। এই অর্থনৈতিক সংকটের সময় তা দেশের জন্য ভালো হবে না, প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিরাও বিপদে পড়তে পারেন।
Manual5 Ad Code
সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি খতিয়ে দেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন কেউ কেউ।
Manual1 Ad Code
২০২৪ সালর ৫ অগাস্ট জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশে দুয়েকজনকে এরকম কালেমা খচিত পতাকা প্রদর্শন করতে দেখা যায়।
বিষয়টি নিয়ে তখন দেশের কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবে গত দুই সপ্তাহে ঢাকা থেকে শুরু হওয়া পতাকার জোয়ার দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়েছে। বিভিন্ন সেতু ও ফ্লাইওভার এই পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় পতাকা হাতে মিছিল ও মোটরসাইকেল মিছিল করা হচ্ছে।
এ নিয়ে আলোচনা বা বাদানুবাদ চললেও বিষয়টি নিয়ে নীরব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতেও রাজি হননি।
ইসলাম ধর্মের ভিত্তি ধরা হয় কলেমা তাইয়্যেবাকে। যেখানে বলা হয়েছে, “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।”
বিগত দশকগুলোতে আল কায়েদা, ইসলামিক স্টেট, বোকো হারামের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই কালেমাকে তাদের পরিচিতির (ব্রান্ডিংয়ের) অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
কালো কাপড়ের জমিনে সাদা আরবি হরফে লেখা কালেমা তাইয়্যেবাকে নিজেদের পতাকা বা চিহ্ন হিসেবে প্রদর্শন করে আসছে এই উগ্রবাদী সংগঠনগুলো। যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের একাংশের মানুষের কাছে কালেমাখচিত এই পতাকা উগ্রবাদের ‘প্রতীক’ হয়ে উঠেছে।
গত কয়েক দিনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় কালেমার পতাকা দিয়ে রাস্তা ও সেতু শোভিত করা বা পতাকা হাতে মোটরসাইকেল মিছিল করতে দেখা গেছে লোকজনকে। কোথাও কোথাও মিছিলকারীরা নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৭ অগাস্ট জাতীয় সংসদের সামনে হিযবুত তাহরীরের মিছিলে কালেমা লেখা পতাকা দেখানো হয়। ছবি: বিবিসি বাংলা
ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে ‘কালেমার পতাকা অপসারণ ও অবমাননার’ প্রতিবাদে শুক্রবার বগুড়ার শেরপুরে ‘তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে কালেমাখচিত পতাকা হাতে মিছিল করেছেন একদল লোক। ওই মিছিলে বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা ও ফিলিস্তিনের পতাকাও বহন করতে দেখা গেছে।
গত বছর ‘তৌহিদী জনতা’র বিরুদ্ধে বিভিন্ন পীরের দরগা, মাজার ও বাউলদের আখড়ায় হামলার অভিযোগ উঠেছিল। তবে সেই ‘তৌহিদী জনতা’ এবং পতাকা হাতে মিছিলকারী ‘তৌহিদী জনতা’ একই গোষ্ঠী কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফেইসবুকের বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক পেইজ ও মার্কেটপ্লেসে অনেকেই কালেমাখচিত পতাকা বিক্রি করছেন।
আকার ভেদে ১১০ থেকে ৩৩০ টাকা পর্যন্ত দামে পতাকা পাওয়া যাচ্ছে।
ফেইসবুকের বিভিন্ন পেইজে পতাকা ওড়ানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতা মুফতি হারুন বিন ইজহারকে ‘উদ্ধৃত’ করা হচ্ছে।
হারুন ইজহার এমন পতাকা ছড়িয়ে দিতে বলেছেন–এমন ফটোকার্ডও ফেইসবুকের বহু পেইজ ও আইডিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
Manual5 Ad Code
তবে মাসুক মিডিয়া নামে একটি ফেইসবুক চ্যানেলে প্রচারিত মুফতি ইজহারের ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “এই যে আর্জেন্টিনা, তারপরে এই যে বদমায়েশি শুরু হইছে। আলহামদুলিল্লাহ আমাদের তরুণেরা কালেমার পতাকা লাগানো শুরু করছে। আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগাই দিবেন। যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে তাহলে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এগুলো সব পতাকা নামেইতে হবে। এগুলো থাকবে তো আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে।”
শুক্রবার চট্টগ্রামের একটি মসজিদে হারুন ইজহারের দেওয়া বয়ানের একটি ভিডিও তার নিজের পেইজেও শেয়ার করা হয়েছে। সেখানে তিনি কলেমার পতাকা বিষয়ে বলেন, “কিছু কৌশলগত বিষয় আছে এটা একটু বোঝার চেষ্টা করবেন। এই কালেমার পতাকা মানেই কি আইএস, তালেবান নাকি?
“এটা হওয়ার কারণ আছে, সেটা হল আমাদের যুবকরা যে পতাকার ডিজাইনটা ব্যবহার করে… যেহেতু তালেবান একটা বিশাল শক্তি বিশ্বের এবং অনলাইনের কারণে বিভিন্ন আরো জিহাদি সংগঠনগুলোর পতাকা পরিচিত হয়ে গেছে। আর ডিজাইন করতে গেলেই ওই ডিজাইনগুলো চলে আসে। কেন, আপনারা তো বর্ণাঢ্য পতাকা করতে পারেন।”
ফেইসবুক এবং বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কালেমা লেখা পতাকা বিক্রিও হচ্ছে।
তার ভাষায়, কালেমার পতাকার বিষয়ে কেউ কেউ ‘অযথা আতঙ্কিত’ হচ্ছেন এবং এটি ‘মানসিক রোগ’।
অন্যদিকে কালেমার পতাকা ওড়ানো নিয়ে ইসলামি লেখক ফারুক ফেরদৌস ফেইসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, “কালিমা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও কালিমা বা আয়াত খচিত পতাকা ব্যবহার করে। প্রশ্ন হচ্ছে কালিমাসহ পতাকার নির্দিষ্ট ডিজাইন নিয়ে–যা বাইরের কোনো কোনো গোষ্ঠীর পতাকার সাথে মিলে যায় এবং এটা নিয়ে বিপদজনক অপপ্রচারের আশংকা তৈরি হয়।”
আরেক ইসলামি লেখক মনযূরুল হক তার ফেইসবুকে লিখেছেন, “কালেমা লেখা পতাকা দেখেই ভড়কায়েন না। সৌদির পতাকাতেও কালেমা লেখা আছে, তাতে তাদের ইসরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে ইরানে হামলা করতে কুণ্ঠা হয় নাই। যদিও ইরানের পতাকায়ও ‘আল্লাহ’ লেখা আছে।”
তার পর্যবেক্ষণ হল, ‘কালেমার পতাকা’ একটা রাজনৈতিক প্রতীক মাত্র, তাতে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার চেয়ে পতাকাধারীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই বেশি।
মনযূরুল হক বলেন, “যতদূর জানি, নবীজির পতাকায় ‘কালিমা লেখা’ ছিল বলে শক্তিশালী বর্ণনা নেই। তাবারানি থেকে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা ইমাম ইবনে হাজারের মতে দুর্বল (জয়িফ) মত। পতাকায় ইসলামের বাণী বা কালেমা লেখার সূচনা আব্বাসি যুগে হয় বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়।
“কালেমা তো ভালো, খারেজিরা বর্শার মাথায় কোরআন উঁচু করে বলেছিল—‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’, মানে কেবল আল্লাহর বিধান চলবে। আলী (রা.) তখন একটি প্রবাদসম উক্তি করেছিলেন, ‘কালিমাতু হাক্কিন উরিদা বিহাল বাতিল’, মানে তাদের কথা সত্য, কিন্তু মতলব খারাপ।”
নেপথ্যে কী? সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এই পতাকা হাতে মিছিল বা পতাকা ওড়ানোর ঘটনাকে পশ্চিমারা উগ্রবাদের বিস্তার হিসেবে দেখলে বিষয়টি দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে শুরু করে প্রবাসীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কালেমার পতাকা নিয়ে আমাদের কাজ করতে এখনো বলা হয়নি। আমরা দেখছি, এটাকে মনে হচ্ছে ভিনদেশি উগ্রবাদীদের কিছু আচরণ বা সংস্কৃতিকে মূলধারায় আনার চেষ্টা করছে একটা গোষ্ঠী। মনে হচ্ছে তারা খুব সুকৌশলে কালেমার নামে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের নৈতিক সমর্থন পেতে চাইছেন।”
দেশে মানবাধিকারকর্মী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত গুম বিরোধী তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান পতাকার এই বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছেন না।
তিনি বলেন, “এই পতাকাকে কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে সেটা হচ্ছে আমাদের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। যদি সাধারণ মুসলিমরা এই পতাকা ওড়ায় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। তবে একটা উগ্র রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে সমাজকে গ্রাস করার প্রতীকী লড়াইয়ে একটা গোষ্ঠী নেমেছে, এমন আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে।
“যদি উগ্রবাদী আদর্শ বিস্তারের প্রতীক হিসেবে এই পতাকাকে ব্যবহার করে, তাহলে আমাদের বাণিজ্যসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতির সম্ভাবনা থাকে।”
Manual6 Ad Code
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “এই ব্যক্তিরা কারা সেটা আসলে একটু খুঁজে দেখা দরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এখন তারা যেটা বলছে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা ওড়ার যে যুক্তি আসছে, তাতে এখানে অন্য দেশের পতাকা থাকলেও কথা ছিল। কিন্তু এই পতাকা যেটা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সিম্বলিক হিসেবে গণ্য হয়, অনেক অর্গানাইজেশন, যেগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন নামে পরিচিত, তারা ব্যবহার করছে।”
যখন ভারতে কর্মরত ইসরাইলের একজন কূটনীতিক বাংলাদেশে ‘হামাস’ এর তৎপরতার অভিযোগ তুলেছেন, সেই সময়ে এই পতাকা নিয়ে তৎপরতার কথা তুলে ধরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাখাওয়াত বলেন, “কেউ বাংলাদেশকে আবার বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত করার চিন্তাভাবনা করছে বা ওরকম পরিচিতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি না, তাতো বলতে পারি না। আমার মনে হয়, এটা খতিয়ে দেখা দরকার।”