আজ মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিনী সহায়তা বন্ধ হওয়ায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৩০, ২০২৫, ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
মার্কিনী সহায়তা বন্ধ হওয়ায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত

Manual1 Ad Code

টাইমস   নিউজ 

Manual7 Ad Code

বিদেশে মার্কিন সহায়তা স্থগিত করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের প্রভাব অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই দেশটির অর্থায়নে চলমান প্রকল্পের কাজ বন্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হোম অফিস করার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক সহায়তায় পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান সর্বোচ্চ।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সাহায্যের জন্য দেশটি ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে। কিন্তু আমেরিকা ফার্স্ট নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় যাওয়ার প্রথম দিনেই প্রায় সব বৈদেশিক সহায়তা কর্মসূচি স্থগিত করার নির্বাহী আদেশ জারি করেন। শুধু ইসরাইল ও মিশরকে এর বাইরে রাখা হয়।

আপাতত তিন মাসের জন্য এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি।

সহায়তার আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা এই সময়ের মধ্যে পর্যালোচনা করে দেখা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বৈদেশিক সহায়তা সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশকে প্রতিবছর দেওয়া সহায়তার পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। এর আগের বছরগুলোতে আড়াইশো থেকে তিনশো মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ৪৯০ মিলিয়ন ডলার।

ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বা ইউএসএইড এর তথ্য বলছে, এই অর্থ যেসব খাতে ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা, পরিবেশ ও জ্বালানি এবং মানবিক সহায়তা। এছাড়া রোহিঙ্গাদের জরুরি সহায়তার জন্যও বরাদ্দ ছিল এতে।

তবে অন্যান্য বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেলেও রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও পুষ্টি কার্যক্রমের অর্থায়ন বজায় থাকবে, ইউএসইডের বরাতে এমনটি জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

কিন্ত তিন মাসের জন্য অন্যান্য সহায়তা প্রকল্পগুলো থমকে যাওয়া বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে? এতে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন?

ইউএসএইডের কার্যক্রম

জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংকের মত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমেও বিভিন্ন দেশে সহায়তা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দেশটির সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ইউএসএইডের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে এই সংস্থাটির কার্যক্রমের মূল ক্ষেত্রগুলো হলো:

খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে ইউএসএইডের তরফে। এর মাধ্যমে পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির সুযোগ মেলে প্রকল্পের আওতাধীন প্রান্তিক মানুষের। এছাড়া, জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নেও সহায়তা করে তারা।

দক্ষিণাঞ্চলে ২৩টি জেলায় এমন প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছিল বলে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণতন্ত্র মানবাধিকার ও শাসন

Manual6 Ad Code

বাংলাদেশে সুশাসন ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতেও ইউএসএইডের বিভিন্ন প্রকল্প চলমান ছিল। সংস্থাটির মতে, সরকারের প্রতি নাগরিকদের আস্থা বাড়াতে এবং মানবাধিকার রক্ষায় সহায়ক এসব প্রকল্প।

পরিবেশ ও জ্বালানি

পরিবেশ ও জ্বালানি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নয়নে কাজ করার কথা বলছে ইউএসএইড। যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে।

স্বাস্থ্যসেবা

Manual4 Ad Code

মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ইউএসএইড। এই প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মান উন্নয়নে সহায়তা করে বলে দাবি তাদের।

শিক্ষা

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ইউএসএইডের কর্মসূচি পরিচালিত হতো। শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ করে তারা।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সহায়তা

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তায় ভূমিকা পালন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো। শরণার্থীদের জন্য খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে তারা।

প্রকল্প বন্ধ ও স্থগিত করেছে উন্নয়ন সংস্থাগুলো

কর্মসূচির ব্যাপ্তি ও বিপুল কর্মী সংখ্যার কারণে বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি ও অলাভজনক উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে পরিচিত ব্র্যাক।

বাংলাদেশ-ভিত্তিক সংস্থাটির কাজ রয়েছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর বাংলাদেশসহ মোট চারটি দেশে নয়টি কর্মসূচি স্থগিত করেছে সংস্থাটি।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, বাংলাদেশে মার্কিন অর্থায়নের ছয়টি প্রকল্প স্থগিত করেছেন তারা।

‘এর মধ্যে তিনটি প্রোজেক্ট সরাসরি আমরা বাস্তবায়ন করি, তিনটি অন্য এনজিও দিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছিল,’ বলেন সালেহ।

এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান ও লাইবেরিয়াতে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের চলমান তিনটি প্রজেক্টও আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

‘ডাইভারসিটি ইনক্লুশনের (বৈচিত্রের অন্তর্ভুক্তি) প্রজেক্ট থাকলে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। আমাদের নির্দিষ্টভাবে ডাইভারসিটি ইনক্লুশনের প্রোগ্রাম নাই নির্দিষ্টভাবে। ফলে একেবারে বন্ধ বা বাতিল করতে হয়নি। কিন্তু ডিরেক্ট ফান্ডের প্রোজেক্টগুলো আপাতত স্থগিত রাখতে হয়েছে,’ বলছিলেন আসিফ সালেহ।

এসব প্রকল্প থমকে যাওয়ার কারণে অন্তত ৩৫ লাখ মানুষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন বলে জানান তিনি।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, যদি পর্যালোচনার পর প্রকল্পগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, সেটি ছোট এনজিওগুলোর জন্য একটা বড় ধাক্কা হবে।

Manual4 Ad Code

যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের ওপর নির্ভরশীল আরেকটি উন্নয়ন সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের দুইটি প্রকল্প আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

‘সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কয়েকজনকে হোম অফিস করতে বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সবার মধ্যে,’ যোগ করেন তিনি।

পরিস্থিতি কতটা গুরুতর?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মতৎপরতা চালিয়ে আসছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো। বিদেশি অর্থায়নে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে তারা। এসব প্রকল্পে ক্রমশ বেড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন।

‘কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা জলবায়ু সংক্রান্ত যে প্রজেক্টগুলো আমেরিকার অর্থে চলছে, এগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায় এই তিন মাসে তো একটা সমস্যা হবেই, যদি রিভিউর পরেও কন্টিনিউ করে সেটা কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও ব্যাপক চাপ তৈরি করবে,’ বলছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আইনুল ইসলাম।

‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সরাসরি আঘাত আসতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তিন মাস নিলেও, বাংলাদেশের জন্য এখনই একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ তথা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, জলবায়ু বা জেন্ডারের মতো ইস্যুতে ট্রাম্পের যে অবস্থান, তাতে রিভিউয়ের পরও এই সংক্রান্ত সহায়তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।

অবশ্য এখনই সব শেষ হয়ে গেল এমন ভাবার পক্ষে নন উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।

‘খারাপটা চিন্তা করেই প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে, এখনই সব বন্ধ করে দিতে হবে এমন না। প্রজেক্টগুলোকে জাস্টিফাই করার জন্যও তিন মাস সময় পাওয়া গেল,’ বলেন তিনি।

সালেহ বলেন, ‘ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে যাদের নিয়ে আমরা কাজ করি, তাদের জীবনযাত্রার মান সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর ইমপ্যাক্ট ফেলে। একটা মানুষ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সে আরও ১০টা কাজ করবে না যা সমাজের ক্ষতির কারণ হয়।’

প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের অবনমন হলে তা আঞ্চলিক এমনকি বৈশ্বিক পর্যায়েও অশান্তির কারণ হতে পারে বলে অভিমত তার। যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই বিঘ্নিত করবে।

‘এই গ্রুপ থেকেই ইলিগ্যালি মাইগ্রেট করে, ইলিগ্যালি ট্রাফিকিংয়ের শিকার হয়,’ যোগ করেন তিনি।

এই পর্যায়ের মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়লে, তা দেশের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে বলে উল্লেখ করেন সালেহ। তিনি বলেন, ‘আগামী তিন মাসে ইউএস গভর্নমেন্টকে এগুলোর ইমপ্যাক্ট আমাদের বোঝাতে হবে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা