আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বিশেষ বার্তা বহনকারী একটি বাজেট হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে থাকা নানা জটিলতা কমানোর উদ্যোগ, অপরদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বড় সম্প্রসারণ, ফ্রিল্যান্সারদের করমুক্তির পরিকল্পনা, কৃষক ও নারীপ্রধান পরিবারের জন্য নতুন সহায়তা কর্মসূচি—সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে প্রায় প্রতিটি শ্রেণির মানুষের জন্যই কিছু না কিছু থাকছে।
প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত এই বাজেটে সরকার অর্থনীতির গতি বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টাও করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই বাজেটে সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছেন কারা? ব্যবসায়ী, কৃষক, ফ্রিল্যান্সার, নাকি সাধারণ মানুষ?
ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি
বহু বছর ধরে দেশের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন যে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার জটিলতা ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এবার সেই অভিযোগ আমলে নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসিক ভ্যাট পরিশোধ অব্যাহত থাকলেও রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে প্রতি তিন মাস পরপর। অর্থাৎ বছরে ১২ বার নয়, মাত্র ৪ বার রিটার্ন দাখিল করলেই চলবে।
এছাড়া অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা, ইআরপি সফটওয়্যার ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, নতুন কর আরোপের পরিবর্তে ব্যবসা সহজ করার এ উদ্যোগ বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের জন্য বড় সুবিধা
Manual7 Ad Code
দেশের বন্দরে পণ্য আটকে থাকা, নমুনা পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত ডেমারেজ চার্জ দীর্ঘদিনের সমস্যা। বাজেটে নমুনা পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএসটিআই ও অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের পাশাপাশি আইএসও ও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড অনুমোদিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও পরীক্ষা করা যাবে।
একইসঙ্গে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সুবিধা সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বিশ্বস্ত আমদানিকারক ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান দ্রুত পণ্য ছাড়ের সুবিধা পাবে।
ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় সুখবর
ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেটের অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর ৭.৫ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনা। বর্তমানে বিদেশ থেকে আসা আয়ের ওপর কর কাটা হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অর্জিত বৈদেশিক আয়ের ওপর আর উৎসে কর দিতে হবে না। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত তরুণ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল পেশাজীবীদের জন্য বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে।
নারীপ্রধান পরিবার পাচ্ছে নতুন ‘ফ্যামিলি কার্ড’
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সবচেয়ে বড় নতুন সংযোজন হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে এ কার্ড দেওয়া হবে। প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের ইতিহাসে দরিদ্র পরিবারভিত্তিক সবচেয়ে বড় নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।
কৃষকদের জন্য আসছে কৃষক কার্ড
খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন ধরে রাখতে কৃষকদের জন্যও নতুন কর্মসূচি চালু হচ্ছে। ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষক কৃষক কার্ড পাবেন। প্রত্যেককে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই সহায়তা কৃষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের ভাতা বাড়ছে
সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা। বয়স্ক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬২ লাখ করা হবে। বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা নারীদের ভাতাও বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষা বৃত্তির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা কর্মসূচি
কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য নতুনভাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় ১৫ হাজার শ্রমিককে মাসে ৫ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবে।
রফতানিমুখী শিল্প খাতে অস্থিরতা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই উদ্যোগ শ্রমিকদের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য প্রথমবারের মতো সম্মানি
বাজেটে নতুন আরেকটি উদ্যোগ হচ্ছে— মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ভাতা। ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষ, খাদেমসহ প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এই সুবিধা পাবেন। এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় একটি নতুন সংযোজন।
জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য ভাতা
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের জন্যও মাসিক সম্মানি ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শহীদ পরিবার এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিরা মাসে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা পাবেন। এ উদ্যোগকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মেট্রোরেল যাত্রীদের জন্যও স্বস্তি
রাজধানীর জনপ্রিয় গণপরিবহন মেট্রোরেলের ভাড়ার ওপর বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি আরও এক বছর বাড়ানো হতে পারে। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন লাখ যাত্রী মেট্রোরেল ব্যবহার করেন। ভ্যাট ছাড় অব্যাহত থাকলে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে না।
করদাতাদের জন্যও আসছে স্বস্তি
এবারের বাজেটে ন্যূনতম কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং কর কাঠামোকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এনবিআর সূত্র বলছে, দীর্ঘমেয়াদি করনীতি ঘোষণার মাধ্যমে ব্যক্তি ও করপোরেট করদাতাদের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হবে।
সবচেয়ে বড় চমক কার জন্য?
বাজেটের প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা নিম্ন আয়ের মানুষ। কারণ এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।
Manual8 Ad Code
তবে ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, ফ্রিল্যান্সারদের করমুক্তির উদ্যোগ, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য ফ্যামিলি কার্ডও বাজেটের বড় আকর্ষণ।
সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের মূল বার্তা হচ্ছে—নতুন করের চাপ নয়, বরং ব্যবসা সহজ করা, ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ। ফলে ব্যবসায়ী, কৃষক, ফ্রিল্যান্সার, শ্রমিক, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী থেকে শুরু করে নগর যাত্রী—প্রায় সব শ্রেণির মানুষের জন্যই থাকছে কোনও না কোনও চমক।তথ্য সুএ:বাংলা ট্রিবিউন