আজ মঙ্গলবার, ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ এশিয়ায় পুতিনের সেনারা আসছে, ভারতের চালে আমেরিকাকে পাল্টা মার রাশিয়ার

editor
প্রকাশিত মে ৩, ২০২৬, ১০:৫৯ অপরাহ্ণ
দক্ষিণ এশিয়ায় পুতিনের সেনারা আসছে, ভারতের চালে আমেরিকাকে পাল্টা মার রাশিয়ার

Manual1 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

অনেকটা সবার অজান্তেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। একদিকে আমেরিকা যখন ভাবছিল ভারতকে পকেটে পুরে দক্ষিণ এশিয়াতেও রাজত্ব করবে, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর—সবখানে ওয়াশিংটনের ছক অনুযায়ী কাজ চলবে, ঠিক তখনই রাশিয়া এক মাস্টারস্ট্রোক দিলো। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এমন এক চাল চাললেন, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সমীকরণ ওলটপালট করে দিল। দীর্ঘ আট বছরের আলোচনার পর কার্যকর হলো নয়াদিল্লি ও মস্কোর ঐতিহাসিক সামরিক চুক্তি ‘রেলোস’।

যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি পা রাখছে রুশ সেনারা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যখন পশ্চিমারা রাশিয়াকে একঘরে করতে চেয়েছিল, তখন মস্কো দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক বলয় তৈরি করল। এই ঘটনা ওয়াশিংটনের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

রেলোস চুক্তিতে কী আছে?

‘রেলোস’ চুক্তির পুরো নাম ‘রিসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিকস সাপোর্ট’। সহজ ভাষায়, এটি একটি সামরিক সহযোগিতা বিনিময় চুক্তি।

এই চুক্তির ফলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ, বিমান এবং সেনারা এখন থেকে ভারতের সামরিক ঘাঁটি ও বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তারা সেখান থেকে জ্বালানি নিতে পারবে, খাবার সংগ্রহ করবে এবং প্রয়োজনে মেরামতও করতে পারবে। একইভাবে ভারতও রাশিয়ার বিশাল আর্টিক অঞ্চল ও দূরপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন:যুদ্ধে ধরা পড়ার চেয়ে ‘মৃত্যুকে বরণ করা’ সেনাদের প্রশংসা করলেন কিম জং উন

Manual3 Ad Code

চুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ ৩ হাজার সেনা, ৫টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে রাশিয়ার সাথে এমন চুক্তি আগে কখনো হয়নি।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এটি স্বাক্ষরিত হয় এবং চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি এটি কার্যকর হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর, তবে প্রয়োজনে তা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

রেলোস চুক্তি কেন এত আলোচনায়?

রেলোস চুক্তিটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ কোনো সামরিক চুক্তি নয়; এর পেছনে তিনটি বড় ‘খেলা’ কাজ করছে। প্রথমত, ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই মহাসাগর দিয়ে যায়। এখানে রাশিয়ার উপস্থিতি মানেই ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য।

এতদিন এই অঞ্চলে আমেরিকার যে একক প্রভাব বা পশ্চিমাদের দাপট ছিল, এখন সেখানে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ও সেনাদের নিয়মিত আনাগোনা শুরু হবে।

দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। আমেরিকা ও ইউরোপ যখন রাশিয়ার ওপর শত শত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাকে একঘরে করতে চাচ্ছে, তখন এই চুক্তি প্রমাণ করল রাশিয়া মোটেও একা নয়। এটি কেবল একটি সামরিক চুক্তি নয়, বরং আমেরিকার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের বিপরীতে রাশিয়ার এক শক্ত পাল্টা জবাব।

তৃতীয়ত, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রধান অস্ত্র বা ‘কাউন্টারওয়েট’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু ভারত রাশিয়ার সাথে এই চুক্তি করে বুঝিয়ে দিল, তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অংশ নয়। এই তিনটি কারণ রেলোস চুক্তিকে কেবল সামরিক নয়, বরং একটি বড় স্ট্র্যাটেজিক সিগন্যাল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

Manual5 Ad Code

রেলোস চুক্তির শেকড় অনেক গভীরে

অনেকে মনে করেন রেলোস চুক্তিটি হুট করে হয়েছে। আসলে তা নয়। এর শেকড় অনেক গভীরে। শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই এই অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাব ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা যখন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে ভারতকে হুমকি দিয়েছিল, সেই কঠিন সময়ে রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) ভারতের পাশে দাঁড়াতে পাল্টা নৌবহর পাঠায়। সেই থেকে ভারতের সামরিক শক্তির প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

তাই আমেরিকা হাজার চেষ্টা করলেও ভারত তার এই পুরনো বন্ধুকে ছেড়ে যাবে না। রেলোস চুক্তিটি আসলে সেই পুরনো বন্ধুত্বেরই একটি আধুনিক এবং শক্তিশালী রূপ। এটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে রাশিয়ার উপস্থিতি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা।

Manual8 Ad Code

রাশিয়ার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মস্কোর জন্য এই চুক্তিটি দক্ষিণ এশিয়ায় এখন তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জায়গা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রির জন্য এশিয়া বড় বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত রাশিয়ার সস্তা অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা। মস্কোর জন্য এই চুক্তি কেবল জ্বালানি বিক্রির পথ নয়, বরং সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ।

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ আন্দ্রে করতুনভের মতে, এর মাধ্যমে রাশিয়া ভারত মহাসাগরে নিজেদের নৌবাহিনীর শক্তি স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি করার সুযোগ পেল।

অর্থাৎ, রাশিয়া প্রমাণ করল যে, পশ্চিমাদের শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম।

ভারত কী সুবিধা পাবে?

ভারতের জন্য এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রার মতে, ভারত এখন রাশিয়ার আর্কটিক এবং দূর প্রাচ্যের রুশ ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে। এটি ভারতকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলে যাওয়া নতুন নতুন সামুদ্রিক রুটে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেবে।

এছাড়া ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মাথাব্যথার কারণ। রাশিয়ার সাথে ভারতের এই চুক্তি চীনের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

রাশিয়ার বলয় ও আমেরিকার দুশ্চিন্তা

আমেরিকা এখন গভীর দুশ্চিন্তায়। কারণ তারা ভারতকে তাদের ‘কোয়াড’ জোটের মাধ্যমে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া এখন সেই ভারতকে ব্যবহার করে নিজেদের বলয় শক্ত করছে।

আমেরিকা দেখছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে চীন, অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ভারতের এই গভীর সম্পর্ক আমেরিকার এশিয়ান প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ভয় পাচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোও এখন রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

Manual3 Ad Code

পাকিস্তান ও ভারতের ক্ষেত্রে আমেরিকার ভিন্ন অভিজ্ঞতা

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে আমেরিকার ইতিহাস বেশ পুরানো। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে এতদিন পাকিস্তানকে নিজেদের স্বার্থে প্রায় পুরোদমে ব্যবহার করেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় হোক কিংবা আফগানিস্তানে সোভিয়েত বিরোধী লড়াই—পাকিস্তান সব সময় ওয়াশিংটনের আজ্ঞা মেনে চলেছে। আমেরিকা পাকিস্তানের ভূমি, আকাশপথ এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে।

ওয়াশিংটন যখন যা চেয়েছে, পাকিস্তানের থেকে আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে আমেরিকার এই ‘পাকিস্তান ফর্মুলা’ একদমই কাজে আসছে না। আমেরিকা চেয়েছিল ইউক্রেন ইস্যুতে ভারত যেন রাশিয়ার সরাসরি বিরোধিতা করে, কিন্তু ভারত তা করেনি। বরং তারা রাশিয়ার সাথে ‘রেলোস’ চুক্তি করে বুঝিয়ে দিল যে, ওয়াশিংটন ভারতকে কোনোভাবেই পাকিস্তানের মতো ‘পকেট রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। যা আমেরিকার জন্য চরম অস্বস্তির কারণ।

ডাবল গেম খেলছে ভারত

ভারত বর্তমানে এক অদ্ভুত ও জটিল খেলায় লিপ্ত, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘ডাবল গেম’। ভারতের হাতে এখন দুটি তলোয়ার। এক হাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘লেমোয়া’ চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে আমেরিকার সাথে সামরিক রসদ বিনিময় করা যায়। অন্যদিকে তারা রাশিয়ার সাথে ‘রেলোস’ করল।

যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব ধরে রাখতে ভারতকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দিচ্ছে। কিন্তু ভারত সেই প্রযুক্তি নিয়েও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না। ভারত একদিকে আমেরিকার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের অংশীদার হচ্ছে, আবার রাশিয়ার এস-৪০০ মিসাইল সিস্টেম কিনে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।

ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা

এই লড়াই কেবল ভারত আর রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ‘ডাবল গেম’ একদিকে তাকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত করছে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে রুশ যুদ্ধজাহাজের নিয়মিত উপস্থিতি এবং বিপরীতে মার্কিন ও পশ্চিমা জোটের নজরদারি এই জলসীমায় স্নায়ুযুদ্ধের মতো উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। সুএঃ সময় নিউজ