ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচলিত সম্পর্কের বাইরে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পৃক্ততা বাড়াতে আগ্রহী তুরস্ক। সেই বার্তা নিয়েই ৪ জুন তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও তাঁর মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা গত সোমবার প্রথম আলোকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
একাধিক কারণে হাকান ফিদানের এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর এটি বাংলাদেশে তুরস্কের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম সফর। একই সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম ঢাকা সফর।
ল
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরটি কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিয়মিত ধারাবাহিকতা নয়; এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তুরস্ক দ্রুত ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও বেড়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, হাকান ফিদান শুধু একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নন; ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির প্রধান ছিলেন। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তাঁকে তুরস্কের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে তাঁর ঢাকা সফরকে অনেক পর্যবেক্ষক কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন সফর হিসেবে দেখছেন।
আঙ্কারায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এশিয়ার একাধিক দেশ সফরের অংশ হিসেবে হাকান ফিদান বাংলাদেশে আসছেন। গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আঙ্কারায় সফর করেছিলেন। ঢাকায় এটি তারই ফিরতি সফর।
Manual6 Ad Code
আলোচনায় কৌশলগত সহযোগিতা
ঢাকা ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরের আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নিরাপত্তা সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বয় গুরুত্ব পেতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ড্রোন, সামরিক প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
Manual7 Ad Code
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক বাংলাদেশকে শুধু একটি বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বরং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভাবনাময় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। তুরস্কের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এখন শুধু শ্রমবাজার বা বাণিজ্যের অংশীদার নয়। রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলোতেও দুই দেশ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চায়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানছবি: রয়টার্স
Manual8 Ad Code
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সফরের সময় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করতে পারেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেবেন।
রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্ক শুরু থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম সক্রিয় সমর্থক দেশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আঙ্কারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছে।
সম্পর্কের নতুন মাত্রা?
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সফরটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। বর্তমানে বাংলাদেশ একদিকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধিকে ঢাকার বৃহত্তর কূটনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
Manual3 Ad Code
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সফরটির তাৎপর্য কোনো একক চুক্তি বা ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে ঢাকা ও আঙ্কারা তাদের সম্পর্ককে বাণিজ্যিক সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিসরে নিয়ে যেতে আগ্রহী। ফলে হাকান ফিদানের আসন্ন ঢাকা সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তথ্য সুএঃ প্রথম আলো