উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তোফায়েল আহমেদের কফিন শহীদ মিনারে নিতে বাধা কী ছিল?
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তোফায়েল আহমেদের কফিন শহীদ মিনারে নিতে বাধা কী ছিল?
editor
প্রকাশিত জুন ৩, ২০২৬, ০১:২৯ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্রকে শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুব জামান।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তোফায়েল আহমেদকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ।
বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদের মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার পদক্ষেপের অন্যতম উদ্যোক্তা ‘আমরা একাত্তরের’ সভাপতি মাহবুব জামানের ভাষ্য, ৪২টি সংগঠন নিয়ে গঠিত একটি প্লাটফর্মের তরফে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগ নিয়ে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরের কাছে লিখিত ‘অবহিতপত্র’ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাতে সাড়া দেয়নি।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, তারা এ ধরনের কোনো আবেদেনই পায়নি।
প্রয়াতের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন বলছেন, “এত বড় মাপের লোকজন শুধু দিয়েই যায়, বিদায়বেলা অনেক কিছু পায় না। অনেক কষ্ট আছে।”
কফিন শহীদ মিনারে নেওয়ার বিষয়ে পারিবারিকভাবে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে চাননি তিনি।
তোফায়েল আহমেদের পরিবারের আরেক সদস্য মঙ্গলবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনুমতি পাওয়া যায়নি, তাই শহীদ মিনারে নেওয়া হবে না।”
বর্ষীয়ান রাজনীতিক আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকালে নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে আট মাস আট দিন ধরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বেলা সাড়ে ৩টায় তার মৃত্যু হয়।
তোফায়েল আহমেদের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল খায়ের সেদিন বলেছিলেন, “আগামীকাল সকাল ১১টায় শহীদ মিনারে তোফায়েল আহমেদের কফিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানাবেন।”
Manual5 Ad Code
তবে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে তিনি বলেন, “শহীদ মিনারে মরদেহ নেওয়ার কথা ছিল, যেকোনো কারণে নেওয়া হচ্ছে না।”
সেই কারণ আর খোলাসা করেননি খায়ের।
এদিন ভোলায় দুই দফা জানাজা শেষে সদর উপজেলার কোড়ালিয়া গ্রামে মা-বাবা ও স্ত্রীর কবরের পাশে তোফায়েল আহমেদকে সমাহিত করা হয়। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার জানাজা হয়।
সেই জানাজা শেষে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “অবশ্যই এই বর্ষীয়ান নেতাকে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার সুযোগ করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। আর সংসদ ভবনে উনার জানাজা পড়ার ব্যবস্থা করাও সরকারের দায়িত্ব।”
সে রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ফেইসবুকে লেখেন, “কারিনা কায়সারের লাশ শহীদ মিনারে নেয়া বিএনপি তোফায়েল আহমেদকে শেষ শ্রদ্ধা জানাইতে দেয় কি না শহীদ মিনারে- সেইটা হবে ওদের লিটমাস টেস্ট।”
ঢাবি কর্তৃপক্ষের ‘সাড়া মেলেনি’
মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামানের দাবি, ৪২টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন, নারী-শিশু-ছাত্র-যুব সংগঠন মিলে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, ২৬ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে পতাকা মিছিল করে থাকে। মঙ্গল শোভাযাত্রাও করে এ প্লাটফর্ম।
“সম্মিলিত উদ্যোগ হিসেবে এ প্লাটফর্ম থেকে আমরা ঢাবি ভিসি ও প্রক্টরকে অবহিত করেছিলাম শহীদ মিনারের কর্মসূচি। সাধারণত শহীদ মিনারে প্রোগ্রাম করতে হলে অনুমতি নয়, অবহিত করতে হয়। আমরা একটা লিখিত অবহিতপত্র দিয়েছিলাম গতকাল (সোমবার)। মঙ্গলবার সকালেও তার উত্তর পাইনি।”
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তোফায়েল আহমেদের মরদেহ শহীদ মিনারে আনার বিষয়ে কেউ কোনো আবেদন করেনি। আমরা ফেইসবুকে দেখেছি যে, (কফিন) আনা হবে—এরকম একটা বিষয়। এখন আমাদেরকে চিঠি দিলে তাহলে, আমরা বলতে পারতাম আনা হবে কি না।”
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
স্বাধীনতার পর ডাকসুর যে কমিটিতে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ভিপি হন, সেই কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ছিলেন মাহবুব জামান। ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষের জন্য এ সংসদ গঠিত হলেও তা ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুব জামান বলেন, “তোফায়েল ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে বিশেষ করে মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে কথা হয় সোমবার। আমরা ফেইসবুকে দিয়েও দিয়েছি, ফটোকার্ড হয়, প্রিন্টও করা হয়। গতকাল প্রথমে বলেছিল, পারা যাবে। কিন্তু গভীর রাতে জানানো হয়- কোনো কারণে শহীদ মিনারে নেওয়া যাবে না।”
কর্মসূচি স্থগিত করে মঙ্গলবার সকালে ফেইসবুকে পোস্ট দেন মাহবুব জামান। এদিন বেলা ১১টার পরে শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের ফিলিংসটা হচ্ছে—আমরা ষাটের দশকের তরুণ, আমরা তোফায়েল ভাইকে দেখেছি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে, ডাকসুর ভিপি হিসেবে, আমিও ডাকসুর জিএস ছিলাম স্বাধীনতার পরে।
“আমি শহীদ মিনারে গিয়ে দেখলাম চারদিকে পুলিশ দিয়ে ঘেরাও করে রাখছে, ছড়নো ছিটানো কিছু লোকজন রয়েছে।”
সোশাল মিডিয়ায় কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়ার দায়বদ্ধতা থেকে শহীদ মিনারে উপস্থিত হন বলে জানান ৭৬ বছর বয়সি সাবেক এ ছাত্রনেতা।
মঙ্গলবার সকাল ৯টার পর থেকে শহীদ মিনার এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়।
শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তার কাছে নেই।
রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “তোফায়েল আহমেদের মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়া হবে—বিষয়টি আমি অবগত নই। কেউ আমাদের বলেননি।”
তাহলে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলো কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “অতিরিক্ত পুলিশ কেন মোতায়েন করা হয়েছে, আমি এ সম্পর্কে কোনো কিছু জানি না।”
‘সংসদ প্রাঙ্গনেও জানাজা হওয়া উচিত ছিল’
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্রকে শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুব জামান।
তার কথায়, “তোফায়েল ভাই তো আসলে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ষাটের দশক, আট-নয়বারের এমপি ছিলেন; সংসদের সাউথপ্লাজায় একটা জানাজা হওয়া উচিত ছিল। এখন আমাদের দুঃখবোধ হচ্ছে—ইনটেরিম গভর্মেন্ট যা করেছে, একটা নির্বাচিত সরকারও সেরকম আচরণ করছে। তাহলে তো দেশে রাজনীতিটা দাঁড়াবে না।”
তিনি বলেন, “আমি কোনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলছি না। বলছি—রাজনীতি দাঁড়াতে হলে সবাইকে সহনশীল হতে হবে; সবার ইনক্লুসিভনেস লাগবে।
“একজন তোফায়েল আহমেদকে সম্মান জানানো যাবে না, তার মৃত্যুতে শোক পালন করা যাবে না—এটা তো হতে পারে না। ইনটেরিমের এক্সটেনশন যদি হয়ে যায় নির্বাচিত সরকার, তাহলে দেশের জন্য দুর্ভোগ আছে।”
শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে এসেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল হায়দার মুকুল।
Manual7 Ad Code
তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, “গতকাল মাহবুব জামানের একটা স্ট্যাটাস, উনিও বলছেন যে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করব, আপনারা আসেন। আমি মাহবুব জামানের স্ট্যাটাস দেখেই আসছি আরকি।
Manual7 Ad Code
“…সরকার এইটা না করলেও পারতো, আপনারা সবাই জানেন। এইটা এমন কিছু না, এখানে যদি ধরেন যে পাঁচ লাখ লোকেরও সমাগম হইতো, কী হইতো? তারা এসে যে যার মতো চলে যেত বাড়িতে, তাইতো? এতে এমন কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হত বলে আমার মনে হয় না।”
তিনি বলেন, “আমি জাস্ট অ্যাজ এ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে, আমি আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানাতে আসছিলাম এবং তিনি মৃত। তিনি জীবিত না যে তার সঙ্গে কথা বলতে পারব এমন কিছু না। যখন একটা লোক মারা যায়, তখন তার তো নিজস্ব আর কিছু থাকে না- বক্তব্য। হ্যাঁ, তো তাকে শ্রদ্ধা করলে তার কিছু আসে যায় না, না করলেও তার কিছু আসে যাবে না।”তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর