রাষ্ট্রপতির সংস্কার আদেশ অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছে না ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। ক্ষমতাসীনরা চান সংবিধান সংশোধন করতে। আর বিরোধী দলের দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার।
সরকারের মেয়াদের চার মাস অতিক্রম হলেও এ নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটছে সরকার। আর সংস্কারের পক্ষে অনড় জামায়াত।
ইতোমধ্যে ১৭ সদস্যের সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৫ জন সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান। কিন্তু তারা এখনও পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে চাপে রেখেই তারা দাবি আদায় করতে চান।
Manual5 Ad Code
দ্বিমতের সুরাহা হয়নি, গলদ কোথায়?
Manual8 Ad Code
গণভোটের রায় অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল এমপিদের। একটি সংসদ সদস্য ও আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
Manual6 Ad Code
সে হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি পরপর দুটি শপথ নেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন এমপিরা। একটিতে সংসদ সদস্য ও অন্যটি ছিল ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’র সদস্য হিসেবে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সদস্যরা শুধু এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথ নেননি তারা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দ্বিতীয় শপথপত্রটি বিদ্যমান সংবিধানে না থাকায় তারা শপথ নেবেন না। এ নিয়ে শুরু হওয়া দ্বিমতের এখনও সুরাহা হয়নি। দুইপক্ষই অনড়। এরই মধ্যে দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। দুই পক্ষের এমন অনড় অবস্থানের কারণে সংস্কার বা সংশোধন কবে হবে, তা নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, ‘‘আসলে বিষয়টি নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি করেছে তথাকথিত বিরোধী দল জামায়াত। তাদের মূল উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করা। তাই তারা বিদ্যমান সংবিধানকে পুরোপুরি বাতিল করতে চায়। আমরা মনে করি, সংবিধানের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করা দরকার। এটিই সঠিক পন্থা।’’
সংশোধনেই অনড় ক্ষমতাসীনরা
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের বিরোধিতার মাঝে নিজস্ব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথেই হাঁটছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তাদের যুক্তি- যেহেতু বিপ্লবী সরকার গঠন হয়নি, সেহেতু বর্তমান সংবিধানকেই মানতে হবে। তবে দুর্বলগুলো সংশোধন করতে তাদের কোনও আপত্তি নেই। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বিভিন্ন সময়ে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এরই মধ্যে ১৭ সদস্যের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার। এতে ক্ষমতাসীন দলের ১২ সদস্য, আর বিরোধীদল থেকে আরও পাঁচ সদস্য দেয়ার আহ্বান করেছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
Manual4 Ad Code
গত ২৯ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার আগে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরে এ কথা জানান তিনি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘‘বিএনপি তো সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। আমরা তো শুরু থেকেই সংবিধান সংশোধনের কথাই বলে এসেছি। জনগণ যেহেতু আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে রায় দিয়েছে, তাই আমরা জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিরোধী দলকেও বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করা উচিত।’’
কমিটিতে থাকছে না জামায়াত
সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার চায় প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। তাই তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষ করে এক ব্যক্তির দুইবারের বেশি সরকার প্রধান না হওয়া, দুদক, হিসাব নিরীক্ষক ও স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার চায় তারা। সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে এরই মধ্যে রাজপথে কর্মসূচি পালন করছে তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করার কথা। সে অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ নেওয়ার বিধান। আমরা আমাদের কথা রাখলেও সরকারি দল গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। অথচ জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামায় তারাও সংস্কারের পক্ষে স্বাক্ষর করেছিল। তাই আমরা দাবি আদায়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে অবশ্যই সরকারকে চাপে রাখবো। তাই সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আমাদের থাকার প্রশ্নই আসে না।’’
সংসদের বাইরের অংশীজনদেরও মূল্যায়নের দাবি
সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার কমিটিকে সমর্থন জানিয়ে সংসদের বাইরের অংশীজনদেরও কমিটিতে রাখার দাবি করেছেন কেউ কেউ। তারা মনে করেন, জুলাইয়ের দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠন সব অংশীজনকেই সম্পৃক্ত করার কথা। সে হিসেবে চলমান সংবিধান সংস্কার ও সংশোধন বিতর্কের সমাধানের জন্য সংসদের বাইরে থেকেও প্রতিনিধিত্ব রাখতে হবে।
এ বিষয় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘‘বিরোধী দল জামায়াত সব জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন সরিয়ে দিতে চায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের আলোকে রচিত সংবিধান বাতিল করতে চায়। ঐকমত্য কমিশনে আমরা বলেছি, সংবিধানের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু সংস্কারের নামে নতুন করে সংবিধান পুনর্লিখনের সুযোগ নেই।’’ তিনি চলমান সংকট নিরসনে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে সংসদের বাইরে থাকা অংশীজনদেরও রাখার দাবি জানান।তথ্য সুএ:বাংলা ট্রিবিউন