আজ বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিযোগে ৬ এপ্রিল ১৯৭০ শ্রীমঙ্গলে গ্রেফতার হয়েছিলেন ৪ জন

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৫, ২০২৫, ০৫:১৬ অপরাহ্ণ
পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিযোগে ৬ এপ্রিল ১৯৭০  শ্রীমঙ্গলে গ্রেফতার হয়েছিলেন ৪ জন

Manual1 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত:

রোববার ৬ এপ্রিল। পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের এই দিনে পাক সরকার তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার শ্রীমঙ্গল থানার চার জাঁদরেল নেতাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিযোগে তথা জয় বাংলা মামলায় গ্রেফতার করে মৌলভীবাজার জেল হাজতে প্রেরণ করে।

Manual5 Ad Code

শুরু হয় দুর্বার আন্দোলন। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনসাধারণ গ্রেফতারের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমে পড়ে।

‘৬০ এর দশকের শেষ দিকে পাক আমলে শ্রীমঙ্গলের এই দুঃসাহসী চার নেতা আন্দোলন সংগ্রাম সৃষ্টি করে পাক সরকারকে এলাকায় ভীত নাড়িয়ে দিতেন। স্থানীয় কৃষক শ্রমিক ও ছাত্রসহ জনসাধারণকে উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে আন্দোলনে জড়িত করতেন। পাক সরকার থাকতো তটস্থ।

পাকিস্তান সরকার ১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল জয় বাংলা মামলা তথা পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিযোগে সামরিক আইনের স্কিষ্টটি এমন এল আর ক্লোজ এইট এর অধীনে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম ও এস এ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে মৌলভীবাজার জেলহাজতে প্রেরণ করে। পরদিন শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মাঠে ন্যাপের পূর্বনির্ধারিত জনসভা থাকায় এতে যুগের অগ্নিকন্যা বলে খ্যাত তৎকালীন ন্যাপনেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও সাবেক ডাকসুর ভিপি ও ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আহমেদুল কবির ওই জনসভায় তাদের মুক্তির দাবিতে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের হাজারো নেতাকর্মী অসাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার তাদেরে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখিত এই চার নেতা সহ ন্যাপ, আওয়ামী লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ সহ স্বাধীনতাকামী লোকজন ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৪০ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার শ্রীমঙ্গল থানার নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৫ সালের কফের নির্বাচন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ‘৬৯এর গণঅভ্যুত্থান, ও সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটার দিকে জয়লাভ করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সাল থেকে একটানা ৪ দশকের উপর দৈনিক সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকতার জগতে জড়িত ছিলেন। শ্রীমঙ্গলে
ভাষা আন্দোলন, বালিশিরা পাহাড় আন্দোলন ও পাকিস্তান ভাঙ্গা তথা জয় বাংলা মামলার আসামিদের মধ্যে তিনিই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি।

Manual2 Ad Code

ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া ১৯৩৮ সালে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার কালাপুর ইউনিয়ন এর লামুয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর সংকল্প নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ‘৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬ সালের ৬ দফা, ‘৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করেন।
আজীবন সংগ্রামী ত্যাগী এই জননেতা ৮ ফেব্রুয়ারী ’৯২ গ্যষ্টিক আলসার রোগে ভোগে ৫৫ বছর বয়সে মারা যান।

Manual4 Ad Code

১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ রহিম জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর নেতৃত্বেই সর্বপ্রথম ছাত্রলীগের থানা কমিটি গঠিত হয়। ছাত্রলীগ গঠন করার পর বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি লাভ গড়ায় বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা সারাদেশে বৃদ্ধি পেলে ডাক্তার মোঃ আব্দুল আলী, ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ আলতাফুর রহমান চৌধুরী শ্রীমঙ্গল থানায় আওয়ামী লীগ গঠন করলে তিনি তাতে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেন। ১৯৭০ সালের জয় বাংলা মামলায় তিনিও তিন নম্বর আসামি হিসেবে গ্রেফতার হন। মুক্তি লাভ করে পড়ে ভারতে মুজিব বাহিনীতে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। মূলত তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ শ্রীমঙ্গল থানায় শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ ও ১৯৮৮ সালে পর পর দুবার তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ১৯ এপ্রিল রাত ১১:৪০ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আওয়ামী লীগের অপর নেতা এস এ মুজিব ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গলে তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। তিনি খুবই বাগ্মী ছিলেন। ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

Manual8 Ad Code

উপরোক্ত ৪ জাঁদরেল নেতার মধ্যে তিনজন ২০১৪ সালের সরকারের আহবানে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা নাম অন্তর্ভুক্তি করার লক্ষ্যে অনলাইনে আবেদন করা হয়। এস এ মুজিব সাহেবের পরিবারের লোকজন সরকারের ঘোষণা সম্পর্কে অবহিত না থাকার কারণে তার পক্ষে মুক্তিযোদ্ধার হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্তির লক্ষ্যে কোন আবেদন করা হয়নি বলে জানা গেছে । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে স্বাধীনতার দাবিদার বলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ ( যিনি পরে আওয়ামী লীগের কৃষি মন্ত্রী পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছিলেন) ও কিছু সদস্যের সংকীর্ণ রাজনীতির কারণে উপরোক্ত তিনজনের আবেদনের মন্তব্যের ঘরে মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য দিয়ে তাদের আবেদনগুলো জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এ প্রেরণ করা হয়। তাদের মধ্যে একমাত্র রাসেন্দ্র দত্তের আবেদনের শুনানি না হওয়ার কারণে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়। মোহাম্মদ শাজাহান ও এম এ রহিম জীবিত না থাকার কারণে ও তাদের পক্ষে কোন পরিবারের লোকজন আপিল করার নিয়ম কানুন সম্পর্কে অবগত না থাকার কারণে ও যা ঝামেলা পোড়াতে হবে এসব বিবেচনায় আপিল পর্যন্ত যাননি।