বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্মকাহিনি নয়; ত্যাগ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য অধ্যায়। এই ইতিহাসে কিছু সূর্যসন্তানের নাম এতটাই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, যাদের ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের গল্প অপূর্ণ।
তেমনই এক উজ্জ্বল নাম তোফায়েল আহমেদ।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর মধ্যে দিয়ে অবসান ঘটল ইতিহাসের বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়ের।
Manual1 Ad Code
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
Manual4 Ad Code
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হতে শুরু করে। তখন ছাত্রসমাজ ছিল আন্দোলনের প্রধান শক্তি। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন ঐতিহাসিক ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম নেতা।
১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেদিন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সমাবেশে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর বিশাল গণসংবর্ধনায় তখনকার ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। পরে এই নামটিই হয়ে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার প্রতীক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ অবিস্মরণীয় একটি দিন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের আগে ও পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংগঠিত রাখতে ছাত্রনেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তিনি স্বাধীনতার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছেন।
Manual6 Ad Code
স্বাধীনতার পরও তোফায়েল আহমেদ দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে তার অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচয় তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
তোফায়েল আহমেদের বিশেষত্ব হলো তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনালগ্ন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ও অংশীদার। এ কারণেই তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন; দেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।