সিগারেটে কর নয় বাড়বে দাম, স্বর্ণ বিক্রিতে ‘গেইন ট্যাক্স’
ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর ঝলমলে স্বর্ণালংকার— দুই ভিন্ন খাত থেকে কর আহরণে বাড়তি নজরদারির আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার। সেক্ষেত্রে সিগারেটে কর না বাড়িয়ে সরাসরি বাড়ানো হতে পারে সিগারেটের দাম। অন্যদিকে, কর কাঠামোয় আসতে পারে স্বর্ণ বিক্রির নতুন হিসাব। প্রথমবারের মতো করদাতার স্বর্ণালংকার বিক্রির ওপর ‘গেইন ট্যাক্স’ বা লাভকর বসতে পারে।
দাম বাড়ানো ছাড়াও তামাক খাত থেকে সঠিকভাবে রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি পৃথক নীতিমালার প্রস্তুতি চলছে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। এই নীতিমালার আওতায় তামাক খাতে কর ফাঁকি, নকল পণ্য ও অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে কিউআর কোডসহ ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’ প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
Manual2 Ad Code
এছাড়া নতুন, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা, মোবাইল ফোনসহ ইলেকট্রনিক্স খাতের বিনিয়োগকারী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) আমদানি এবং স্থানীয় বিনিয়োগে বড় ধরনের কর ছাড় আসতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সিগারেটের দাম বাড়ানো ও অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে আগামী অর্থবছরে এই খাত থেকে বাড়তি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হতে পারে। আসন্ন বাজেটে সিগারেটের প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। অবৈধ ও নকল সিগারেট এবং জাল স্ট্যাম্প রোধে এয়ার ও কিউআর কোড বসবে। এছাড়া, সিগারেট ফ্যাক্টরি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’-এর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে অবৈধ ও নকল সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। অন্যদিকে, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কর ফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রির লাভের (গেইন) ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ করা হতে পারে।’
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ওপর নতুন করে শুল্ক-কর না বাড়লেও প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে
Manual5 Ad Code
দাম বৃদ্ধিতে সিগারেট থেকে আসতে পারে ১০ হাজার কোটি টাকা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ওপর নতুন করে কর না বাড়িয়ে দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে সিগারেটে প্রায় ৮৩ শতাংশ কর আরোপ রয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ। ফলে সরকার শুল্ক-কর না বাড়িয়ে আসন্ন বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু দাম বাড়ানোই নয়, সিগারেটের সুরক্ষা ও অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে বাজেটে বেশকিছু কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এমনকি সিগারেট খাত নিয়ে একটি সমন্বিত নীতিমালাও আসতে পারে। সিগারেটের দাম বৃদ্ধি ও অন্যান্য নতুন পদক্ষেপের কারণে আগামী বাজেটে সিগারেট খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসবে বলে ধারণা করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ওপর নতুন করে শুল্ক-কর না বাড়লেও প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। বর্তমানে এই খাতে সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ কর চালু রয়েছে। শুল্ক না বাড়িয়ে শুধু মূল্যবৃদ্ধির এই বিশেষ উদ্যোগ এবং অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে তামাক খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)
এনবিআর সূত্র জানায়, অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণসহ সঠিকভাবে রাজস্ব আদায়ে একটি নতুন কাঠামো বা নীতিমালা করা হচ্ছে, যা আসন্ন বাজেট থেকে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। বর্তমানে বাজারে থাকা দেশি ও বহুজাতিক— সব কোম্পানির বিরুদ্ধে কম-বেশি নকল বা জাল স্ট্যাম্প ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক অসাধু চক্র রাজস্ব ফাঁকি দিতে নকল ও অবৈধ সিগারেটে জাল স্ট্যাম্প ব্যবহার করে তা বাজারজাত করে।
এই জাল ও নকল স্ট্যাম্পের ব্যবহার বন্ধ করতে সিগারেটের স্ট্যাম্পে এয়ার ও কিউআর কোড ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এছাড়া, সিগারেট খাতকে ডিজিটাল নজরদারির অংশ হিসেবে ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ, সিগারেটের উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হবে। এর অংশ হিসেবে সিগারেট ফ্যাক্টরিগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে, যা সরাসরি এনবিআর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। মূলত ভ্যাট আইন সংশোধনের মাধ্যমে সিগারেট খাতকে সুরক্ষা ও সঠিক রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করা হবে।
আগামী অর্থবছরে তামাক খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড /
সিগারেট পেপার ও মেশিনারিজ আমদানিতে লাগবে ভ্যাট নিবন্ধন
Manual4 Ad Code
সিগারেটের বাজারে বহু প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকার ভ্যাট নিবন্ধন না নিয়েই বিদেশি এবং দেশি ব্র্যান্ডের নকল ও অবৈধ সিগারেট উৎপাদন করছে। এসব প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা সিগারেট পেপার ব্যবহার করে। নকল ও অবৈধ এসব সামগ্রীর কারণে বৈধ সিগারেটের বাজার সংকুচিত হচ্ছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তামাক খাতে কর ফাঁকি, জাল স্ট্যাম্পের ব্যবহার এবং অবৈধ বাজার রুখতে বাজেটে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি, উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এনবিআর থেকে সরাসরি তদারকির জন্য প্রতিটি সিগারেট ফ্যাক্টরিতে সিসি ক্যামেরা বসানোসহ আধুনিক ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’ পদ্ধতি অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসগুলোর অভিযান অব্যাহত থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তাই আসন্ন বাজেটে সিগারেট পেপার আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। এখন থেকে ভ্যাট নিবন্ধিত সিগারেট কোম্পানি ছাড়া অন্য কেউ সিগারেট পেপার আমদানি করতে পারবে না। বর্তমানে সিগারেট পেপার আমদানিতে মোট শুল্ককর ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, আসন্ন বাজেটে তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হতে পারে। একই সাথে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত মেশিনারিজ আমদানিতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হতে পারে।
স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স
সাধারণত করদাতারা তাদের আয়কর ফাইলে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার দেখিয়ে থাকেন। মূলত করফাইল ভারী করার জন্য এই স্বর্ণ দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে করদাতার আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি স্বর্ণও ফাইলে দেখানো হয়। অনেকে এই স্বর্ণ উত্তরাধিকার সূত্রে, উপহার হিসেবে বা ক্রয় সূত্রে পেয়ে থাকেন। তবে, এই স্বর্ণ বিক্রি থেকে সরকার এতদিন কোনো কর পেত না।
বাজেটে প্রথমবারের মতো করদাতাদের ফাইলে থাকা পুরনো স্বর্ণালংকার বিক্রির অর্জিত লাভের ওপর ১৫ শতাংশ ‘গেইন ট্যাক্স’ বা লাভকর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
আসন্ন বাজেটে করদাতাদের স্বর্ণ বিক্রি করফাইলে সঠিকভাবে দেখাতে ‘গেইন ট্যাক্স’ চালু করা হতে পারে, যার পরিমাণ হতে পারে ১৫ শতাংশ। উদাহরণস্বরূপ— একজন করদাতা যেদিন থেকে আয়কর ফাইল খুলেছেন, ওই সময় স্বর্ণের যে দাম ছিল, আর বিক্রির সময় যে বাজারমূল্য পাবেন— এই দুইয়ের ব্যবধান বা বাড়তি যে লাভ হবে, করদাতাকে ওই লভ্যাংশের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
বাজেটে প্রথমবারের মতো করদাতাদের ফাইলে থাকা পুরনো স্বর্ণালংকার বিক্রির অর্জিত লাভের ওপর ১৫ শতাংশ ‘গেইন ট্যাক্স’ বা লাভকর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, ব্যবসা সহজ করতে ও বিনিয়োগ বাড়াতে বড় সুখবর আসছে। নতুন ও নারী উদ্যোক্তা, স্থানীয় মোবাইল উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য খাত এবং ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) আমদানি ও এ সংক্রান্ত চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় আকারের করছাড় দেওয়া হচ্ছে
বিনিয়োগকারীদের জন্য আসছে করছাড়
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ব্যবসায়ের খরচ কমাতে আসন্ন বাজেটে ১৬ ধরনের ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমতে পারে। এছাড়া নতুন, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ করছাড় আসতে পারে।
সবুজ শক্তির স্বপ্নে ফাটল: নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও উচ্চ শুল্কে আস্থার সংকট
নিত্য পণ্যে কর ছাড়, অস্ত্র ও বিলাসী গাড়িতে বাড়তি কর
মোবাইল ফোনসহ ইলেকট্রনিক্স খাতের বিনিয়োগকারী, রিনিউয়েবল এনার্জি (নবায়নযোগ্য জ্বালানি), ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) আমদানি ও স্থানীয় বিনিয়োগে বড় আকারের করছাড় আসতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের জন্যও থাকছে বড় ছাড়। অন্যদিকে, রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনার ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) আমদানি ও এ সংক্রান্ত চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় আকারের করছাড় দেওয়া হচ্ছে / ঢাকা পোস্ট
পাশাপাশি কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ এবং স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনে ২২ ধরনের উপকরণের এআইটি কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওয়েলসিড (তৈলবীজ) থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের জন্য ১০ বছরের কর অব্যাহতি (ট্যাক্স হলিডে) আসতে পারে। রিসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে উৎসাহিত করতে এ খাতের কাঁচামাল সরবরাহের ট্যাক্স ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিগারেট খেলে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই মস্তিস্কে যা হয়
ই-সিগারেট পুনরায় নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়নের আহ্বান
সিগারেট কোম্পানির ৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি
অন্যদিকে, বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ও ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ এআইটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হতে পারে।তথ্য সুএঃ ঢাকা পোস্ট