আজ রবিবার, ১২ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে স্বাধীনতার যুদ্ধ

editor
প্রকাশিত মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৬:১১ অপরাহ্ণ
দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে স্বাধীনতার যুদ্ধ

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ। নানা জোয়ার-ভাটা, ঐক্য-বিভেদ সত্ত্বেও এই সংগ্রামের ধারা প্রবহমান ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে যা স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ নেয়। এর নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির মুক্তি-সংগ্রামের প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী ঘটনাক্রম নিজের লেখা বই “মূলধারা ’৭১”-এ তুলে ধরেছেন লেখক মঈদুল হাসান। সমকালের পাঠকদের জন্য অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো–

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দূরবর্তী অনেক কারণ ছিল। এর মধ্যে সর্ববৃহৎ কারণ ছিল ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তিকালে ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থানের সব বিরুদ্ধতাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠন পরিকল্পনার অভিনবত্বে। দ্বিতীয় বৃহৎ কারণ ছিল ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন নানা ভাষাভাষীদের নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের উপযোগী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অন্বেষণে পাকিস্তানি নেতৃবর্গের সম্যক ব্যর্থতা। ফলে পাকিস্তানের কাঠামোগত স্ববিরোধিতার সমাধান না ঘটে বরং দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের স্রোত উত্তরোত্তর প্রবল হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান গঠনের পর থেকেই বাঙালিরা রাষ্ট্র জীবনের সর্বক্ষেত্রে উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও শোষিত হতে শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা কখনও রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন, কখনও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, কখনও জনসংখ্যাভিত্তিক আইন পরিষদ গঠনের দাবি এবং কখনও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের দাবি করে এসেছে।

পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে বাংলার মানুষের সুস্পষ্ট অভিমত প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৫৪ সালে সংঘটিত প্রাদেশিক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে। বিরোধীদলীয় যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মসূচি ‘একুশ-দফায়’ বলা হয়, দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত অপর সকল বিষয় প্রাদেশিক সরকারের অধীনে আনা প্রয়োজন। নবনির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদে যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু অচিরেই পাকিস্তানের শাসকরা যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দিয়ে পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রের শাসন আরোপ করে ব্যাপক দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এরপর শুরু হয় স্বায়ত্তশাসনকামী দলসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিভেদ ও তাদের একাংশের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস।

প্রায় একই সময়ে আন্তর্জাতিক শীতল যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়। পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার এক পর্যায়ে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ফলে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সমস্যা নিরসনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক আইনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ১৯৬০ সাল থেকে পূর্ব বাংলার অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার উপায় হিসেবে পূর্ব বাংলার সম্পদের একতরফা পাচার রোধ এবং সেই সম্পদ সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রদেশের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমে প্রবল হয়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৩ সালে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন এবং এই দলকে পুনরায় পূর্ণ

স্বায়ত্তশাসনের পক্ষাবলম্বী করে তোলেন। ১৯৬৫
সালে কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার যুদ্ধ অমীমাংসিতভাবে শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানে যে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, সেই পটভূমিতে শেখ মুজিব তাঁর বিখ্যাত ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ দাবি।
পূর্ব ও পশ্চিমের বিরোধ ছাড়াও সামরিক বনাম বেসামরিক শাসনের বিষয় ছিল আরেকটি প্রধান রাজনৈতিক বিতর্ক। এই শেষোক্ত বিতর্কের সূত্র ধরে ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুবের ১০ বছর স্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। তার কিছু পরে পূর্ব পাকিস্তানে যখন এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে, তখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্বাধিকারের দাবিসংবলিত ছয় দফা কর্মসূচির প্রবক্তা শেখ মুজিব বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
আইয়ুবের পতনের পর সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য সরাসরি দায়িত্বভার গ্রহণ করলেও গণঅভ্যুত্থানের ব্যাপকতাদৃষ্টে এ কথা তাদের কাছেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দেশে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনের পুনঃপ্রবর্তন অসম্ভব এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের গণদাবি অপ্রতিরোধ্য। এই অবস্থায় সেনাবাহিনী রাজনৈতিক দলসমূহের এক দুর্বল যুক্ত সরকার গঠন করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়। কেন্দ্রে একটি বেসামরিক কোয়ালিশন সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন সামরিকচক্র বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নানা দ্বিপক্ষীয় গোপন সমঝোতা গড়ে তুলতে থাকে। তারই ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

Manual7 Ad Code

চিত্রকর্ম, ১৯৭১: জয়নুল আবেদিন

পূর্ব বাংলার ওপর অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ফল হিসেবে এই অঞ্চলে নির্বাচনের রায় প্রায় সর্বাংশে যায় আওয়ামী লীগের ছয় দফার পক্ষে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসনবিশিষ্ট পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সরকার গঠনে ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন করে, যা ছিল পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে সমূহ আঘাত।

কেন্দ্রে একটি দুর্বল বেসামরিক কোয়ালিশন সরকার গঠনের পূর্ববর্তী পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতাসীন জান্তা পরোক্ষ পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের আশা ত্যাগ করে এবং তৎপরিবর্তে প্রত্যক্ষ সামরিক পন্থায় ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার পরিকল্পনা তৈরিতে উদ্যোগী হয়। পাকিস্তানি জান্তা তাদের পেশাগত প্রবণতার দরুন সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথকে বেছে নেয়। সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য কিছু সময়ের প্রয়োজন ছিল। কাজেই জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বানে নানা গড়িমসির পর ভুট্টোর মাধ্যমে কিছু শাসনতান্ত্রিক বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতীয় পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়। জান্তা পরোক্ষভাবে এ কথাই জানিয়ে দেয়, ছয় দফার ভিত্তিতে রচিত শাসনতন্ত্র তাদের গ্রহণযোগ্য নয় এবং আওয়ামী লীগ ছয় দফার সংশোধনে সম্মত না হলে পরিষদ অধিবেশনের কোনো সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু ছয় দফার পক্ষে পূর্ব বাংলার মানুষের সর্বসম্মত রায়ের ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন আপসরফা ছিল রাজনৈতিক আত্মহত্যার নামান্তর। তা ছাড়া জাতীয় পরিষদ বৈঠক বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে সারা পূর্ব বাংলায় স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ ঘটে। এই অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানকে একটি অসহযোগ আন্দোলনে পরিণত করতে আওয়ামী লীগ অসামান্য সাফল্য অর্জন করে। গণআন্দোলনের উত্তাল জোয়ারে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রদেশের সমগ্র প্রশাসন বিভাগ কার্যত এক বিকল্প সরকারে পরিণত হয়। তৎদৃষ্টে সামরিক জান্তা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, একমাত্র চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমেই বাঙালিদের এ নতুন আত্মপ্রত্যয় প্রতিহত করা সম্ভব।

Manual1 Ad Code

জানুয়ারি বা সম্ভবত তার আগে থেকেই যে সমর প্রস্তুতির শুরু হয়েছিল, তার অবশিষ্ট আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার ধূম্রজাল বিস্তার করা হয়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুগপৎ সন্দিহান ও আশাবাদী থাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পক্ষে আসন্ন সামরিক হামলার বিরুদ্ধে যথোপযোগী সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত একই কারণে ২৫/২৬ মার্চের মধ্যরাতে টিক্কার সমর অভিযান শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব স্বাধীনতার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উঠতে পারেননি। শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী যারা তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েও তাদের সব অনুরোধ উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজিব রয়ে যান নিজ বাসভবনে। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হন হত্যাযজ্ঞের প্রথম প্রহরে। কিন্তু যেভাবেই হোক, ঢাকার বাইরে এ কথা রাষ্ট্র হয়ে পড়ে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন এবং পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্ব দান করে চলেছেন। সম্ভবত তিন সপ্তাহাধিক কালের অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ারে বাংলার সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনায় এমন এক মৌল রূপান্তর ঘটে যে, পাকিস্তানিদের নৃশংস গণহত্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের কাছে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ঘোষণা হয়ে ওঠে এক অভ্রান্ত পথনির্দেশ।

মার্চ-এপ্রিল
২৫-২৬ মার্চে নিরস্ত্র জনতার ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ সামরিক বর্বরতার ক্ষেত্রে সর্বকালের দৃষ্টান্তকে ম্লান করে ফেললেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আক্রমণ ছিল দুর্বল এবং মূলত আত্মঘাতী। পূর্ব বাংলার সর্বস্তরের অধিবাসীর মধ্যে তুলনাহীন ভীতির সঞ্চার করে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু ঢাকার বুকে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড শুরু করায় এবং বিশেষ করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় ‘ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)’-এর সদরদপ্তরের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর ঢালাও আক্রমণ চালাবার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঢাকার বাইরে ঘটনা মোড় নেয় অভাবনীয় বিদ্রোহের পথে।

ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানায় এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনী যথাক্রমে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর এবং ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’-এর সৈন্যদের পাইকারিভাবে হত্যা করতে শুরু করেছে– এসব সংবাদ আগুনের মতো সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আত্মরক্ষা ও দেশাত্মবোধের মিলিত তাগিদে, উচ্চতর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারও আহ্বান ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই বিদ্রোহ শুরু করে। এর ফলে সেনাবাহিনীর নির্মম ও সর্বাত্মক আক্রমণের মাধ্যমে মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানি কর্তৃত্ব পুনঃপ্রবর্তনের যে পরিকল্পনা টিক্কা খানের ছিল, তা বহুলাংশে ব্যর্থ হয়।

Manual1 Ad Code

সশস্ত্র বাহিনীর বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ এবং উদ্ভূত খণ্ডযুদ্ধের মধ্যে চট্টগ্রামে ৮-ইবি ও ইপিআর বাহিনীর সশস্ত্র প্রতিরোধ একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র যখন বিদ্রোহীদের দখলে যায়, তখন ২৬ মার্চ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান এবং ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ৮-ইবির মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। এই সব ঘোষণায় বিদ্যুতের মতো লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, শেখ মুজিবের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালিরা স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই শুরু করে। কিন্তু চট্টগ্রাম বেতারের এইসব ঘোষণার পেছনে না ছিল রাজনৈতিক অনুমোদন, না ছিল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি।

২৬ মার্চের পর থেকে প্রথম দশ দিনের মধ্যে প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্বে তিনটি স্বতন্ত্র উদ্যোগ পরিস্ফুট হয়। প্রথম উদ্যোগ ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর-এর সেনা ও অফিসারদের সমবায়ে গঠিত। মেজর জিয়ার ঘোষণা এবং বিদ্রোহী ইউনিটগুলোর মধ্যে বেতার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হওয়ার ফলে স্থানীয় ও খণ্ড বিদ্রোহ দ্রুত সংহত হতে শুরু করে। প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্বে দ্বিতীয় উদ্যোগের সমাবেশ ও গঠন প্রথম ধারার মতো ঠিক আকস্মিক, অপরিকল্পিত বা অরাজনৈতিক ছিল না।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী যুব সংগঠনের চারজন নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাক সরাসরি কলকাতায় যান। শেখ মুজিবের বিশেষ আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই চার যুবনেতার আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মীদের ওপর বিশেষ প্রভাব ছিল। ভারতে প্রবেশের পর থেকে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারে এক স্বতন্ত্র গোষ্ঠীগত ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাদের নেতৃত্বে এবং ভারতীয় বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়ের (আরএডব্লিউ) পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মুজিব বাহিনী’ নামে প্রবাসী সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এমন এক সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম হয়, এক সময় যার কার্যকলাপ স্বাধীনতা সংগ্রামকে অনেকখানি বিভক্ত করে ফেলে।
এই সংস্থার (আরএডব্লিউ) সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ আকস্মিক ছিল না। যতদূর জানা যায়, পাকিস্তানি শাসকরা যদি কোনো সময় পূর্ববাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াসী হয়, তবে সেই আপৎকালে আওয়ামী লীগপন্থি যুবকদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য শেখ মুজিব ভারত সরকারকে এক অনুরোধ করেছিলেন। এই প্রশিক্ষণ যে উপরোক্ত চার যুব নেতার অধীনে পরিচালিত হবে সে কথা সম্ভবত মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের কোনো এক পর্যায়ে তিনি ভারত সরকারকে জানান। শেখ মুজিবের এই কথিত অনুরোধের সত্যাসত্য নিরূপণের কোনো উপায় না থাকলেও, এই চার যুবনেতা সীমান্ত অতিক্রম করার পর প্রকাশ্যে দাবি করতে থাকেন যে, সশস্ত্র বাহিনী প্রশিক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন ও পরিচালনার জন্য শেখ মুজিব কেবল তাদের চারজনের ওপরেই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, অন্য কারও ওপরে নয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ অবধি তাদের এই দাবি ও ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকে।

প্রতিরোধ যুদ্ধের তৃতীয় উদ্যোগ যদিও অচিরেই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান ধারায় পরিণত হয়, তবু সূচনায় তা না ছিল বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর বিদ্রোহের মতো অভাবিত, না ছিল যুব ধারার মতো ‘অধিকারপ্রাপ্ত’। পাকিস্তানি আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে কার্যত সমগ্র আওয়ামী লীগ সংগঠন দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আক্রমণের অভাবনীয় ভয়াবহতা, সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী নেতার কারাবরণ, পরবর্তী কর্মপন্থা ও নেতৃত্ব সম্পর্কে সম্যক অনিশ্চয়তা ইত্যাকার বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও মূলত মধ্যবিত্ত নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ এক দুর্লভ বৈপ্লবিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কাজে প্রয়াসী হয়। আওয়ামী লীগের এই প্রয়াসে অনেক নেতা এবং অগণিত কর্মীর অবদান ছিল। তাদের মধ্যে মত ও পথের বিভিন্নতাও ছিল বিস্তর। তৎসত্ত্বেও সামগ্রিক বিচারে এই দল পরিণত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান রাজনৈতিক যন্ত্রে এবং যন্ত্রের চালক হিসেবে একজনের ভূমিকা ছিল সন্দেহাতীতরূপে অনন্য। তিনি তাজউদ্দীন আহমদ।
২৫ মার্চের সন্ধ্যায় যখন পাকিস্তানি আক্রমণ অত্যাসন্ন, তখন শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকে ঢাকার শহরতলিতে আত্মগোপন করার নির্দেশ দেন যাতে ‘শিগগিরই তারা পুনরায় একত্রিত হতে পারেন’। তারপর একনাগাড়ে প্রায় তেত্রিশ ঘণ্টা গোলাগুলির বিরামহীন শব্দে তাজউদ্দীনের বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি, যে অনুমানের ভিত্তিতেই তাকে শহরতলিতে অপেক্ষা করতে বলা হয়ে থাকুক, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তরুণ সহকর্মী আমিরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ২৭ মার্চ ঢাকা ত্যাগের আগে দলের কোনো নেতৃস্থানীয় সদস্যের সঙ্গে আলাপ-পরামর্শের কোনো সুযোগ তাজউদ্দীনের ছিল না। তা সত্ত্বেও পরবর্তী লক্ষ্য ও পন্থা সম্পর্কে দুটি সিদ্ধান্ত নিতে তাদের কোন বিলম্ব ঘটেনি: ১. পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক আঘাতের মাধ্যমে যে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার হাত থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাবার একমাত্র উপায় হলো সশস্ত্র প্রতিরোধ তথা মুক্তির লড়াই; ২. এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামকে সংগঠিত করার প্রাথমিক ও অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ হিসেবে ভারত ও অন্যান্য সহানুভূতিশীল মহলের সাহায্য-সহযোগিতা লাভের জন্য অবিলম্বে সচেষ্ট হওয়া।

Manual2 Ad Code

প্রথমে আত্মরক্ষা, তারপর প্রস্তুতি এবং সব শেষে পাল্টা আঘাতের পর্যায়ক্রমিক লক্ষ্য স্থির করে তাজউদ্দীন ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে গিয়ে হাজির হন ৩০ মার্চের সন্ধ্যায়। সারা বাংলাদেশে তখন বিদ্রোহের আগুন। বিদ্রোহী সিপাহিদের পাশে প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দিয়েছে দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। স্বাধীনতার জন্য সারাদেশ তখন একতাবদ্ধ।

(মূলধারা ’৭১- বইটি প্রকাশ করেছে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড)

তথ্য সুএঃ সমকাল