গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন: পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের ‘প্রথম পরীক্ষা’
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন: পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের ‘প্রথম পরীক্ষা’
editor
প্রকাশিত মে ১৯, ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
“বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এই চুক্তির মাধ্যমে এক ‘বড় পরীক্ষার’ মুখোমুখি হবে।
তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থতার মধ্যেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ডিসেম্বরে।
দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ভারত এই চুক্তি নবায়ন করবে কিনা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার এই চুক্তি নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপরও নির্ভর করছে এর ভবিষ্যৎ।
কারণ তিস্তা নদীর পানিবণ্টনে ২০১১ সাল থেকে উভয় দেশের মধ্যে চুক্তির একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তা আটকে যায়।
রোববার (১৭ মে) এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেশটির কলামিস্ট মহুয়া চ্যাটার্জি বলেন, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নের আলোচনা হবে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের জন্য প্রথম ‘বড় চ্যালেঞ্জ’। কারণ সীমান্তের উভয় পাড়েই এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এই চুক্তির আলোচনার মাধ্যমে এক ‘বড় পরীক্ষার’ মুখোমুখি হবে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এর মধ্যেই ভারত ৩০ বছরের চুক্তিটির পরিবর্তে একটি ‘স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন’ চুক্তির কথা ভাবছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বর্তমান পরিবেশগত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে নিজেদের জন্য আরও বেশি ‘সুবিধাজনক শর্তে’ চুক্তিটি নবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
Manual6 Ad Code
অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ ধরে মহুয়ার লেখায় বলা হয়, তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ভারতের মনমোহন সিং সরকারের সময়ে স্বাক্ষরের একেবারে শেষ পর্যায়ে ছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার তার বিরোধিতা করে। রাজ্য সরকারের দাবি ছিল, উত্তরবঙ্গে পর্যাপ্ত পানি নেই এবং তিস্তার পানি যদি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করা হয়, তাহলে উত্তরবঙ্গ ‘শুকিয়ে’ যাবে।
কৌতূহলের বিষয় হল, সে সময় রাজ্য বিজেপিও একই কারণে তিস্তা চুক্তির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। আর রাজ্যের উত্তরবঙ্গ অনেক আগে থেকেই বিজেপির একটি ‘শক্তিশালী ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত।
ফলে তৎকালীন কেন্দ্রীয় এনডিএ সরকারের জন্য তিস্তা চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তা বড় বাধা তৈরি করেছিল।
এখন দেখার বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানি ভাগাভাগিতে রাজি হন কি না। কারণ এই সিদ্ধান্তটি দক্ষিণবঙ্গের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও আলোচনা তৈরি হবে।
মহুয়া চ্যাটার্জি লিখেছেন, পানি বণ্টন চুক্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরোধিতা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি ‘বাফার’ বা ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল। এখন রাজ্যে বিজেপি সরকার থাকায়, এনডিএকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির প্রসঙ্গ পুনরুজ্জীবিত করবে কি না; যার জন্য ঢাকা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিতে বাধা দেওয়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করে। একই সঙ্গে তারা পশ্চিমবঙ্গে জয়ের জন্য বিজেপিকে অভিনন্দন জানায় এবং এই ফলাফলকে রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করে।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির সাফল্যের প্রশংসা করে বলেন, “এই সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাবে।”
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির প্রশ্নে অগ্রগতির আশার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ফলাফলকে যুক্ত করে তিনি বলেন, “আগের সরকার তিস্তা ব্যারেজ চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার এখন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত এই চুক্তির বিষয়ে মোদী সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারবে।”
বিশ্লেষণে আরো বলা হয়, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়গুলোর কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কিছুটা টানাপড়েন চলছে। কারণ বিজেপি বাংলাদেশ থেকে ‘অনুপ্রবেশ’ এবং অবৈধ অভিবাসনকে তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা করেছিল। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পানি বণ্টন প্রশ্নে বিজেপি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
Manual5 Ad Code
মহুয়া চ্যাটার্জি লিখেছেন, “বিজেপি যদি বাংলাদেশের সঙ্গে নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন এতে জনসমর্থন না হারায়।
Manual3 Ad Code
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সর্বশেষ পানি বণ্টন চুক্তি হয়েছিল ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
Manual7 Ad Code
সে সময় দুই দেশ ৫৪টি যৌথ নদী নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তারপরও গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে।