আজ শনিবার, ২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী পেল বাংলাদেশ

editor
প্রকাশিত জুন ২৭, ২০২৬, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী পেল বাংলাদেশ

Manual5 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

ঝলমলে অভ্যর্থনার মধ্যে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সারলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করে সম্পর্কের নতুন যুগে প্রবেশের আকাঙ্খার কথা বলল ঢাকা ও বেইজিং।

বিনিয়োগ আর আর্থিক সহযোগিতার হিসাবে বড় কোনো সংখ্যার ঘোষণা না আসার মধ্যে নতুন নতুন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলেছে উভয় দেশ।


বেইজিং গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ছবি: পিএমও

প্রস্তাব এসেছে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ এবং কৌশলগত সহযোগিতায় নতুন মাত্রা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা তৈরির।

Manual5 Ad Code

এসব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চীনে সফর কেমন হল? কী পেল বাংলাদেশ, এমন আলোচনা সামনে এসেছে।

মালয়েশিয়া হয়ে চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশে সফরকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন বৈঠকের আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

Manual5 Ad Code

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে মূল্যায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেছেন, “আমি বলব, ‘দিস ইস ওয়ান অব দ্য মোস্ট সাকসেসফুল ট্রিপ বাই অ্যানি হেড অব দ্য স্টেট ইন রিসেন্ট টাইমস’।”

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “কারণ আপনি দেখেছেন যে, এর আগে যখন শেখ হাসিনা গেছেন, তখন ধরেন অনেক কিছু আমরা পেয়েছি, কিন্তু শেষ সফরটা ছিল বেশ বাজে। মানে যেটা আমাদের দরকার ছিল, চায়না সেটা ফুলফিল করে নাই। কারণ চায়নার নিজের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে এটা মেলে নাই।

“কিন্তু এখন আমরা যেটা দেখেছি যে, চীন ভিন্ন রকমের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে যে, এটা কেবল বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক। চীন এখন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি নিবদ্ধ নয়, যেটা আগে ছিল। সেজন্য আমি বলব যে, এই সফরটা অনেক সফল।”

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। পরের দিন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।

সে দিনই প্রধানমন্ত্রী পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়।

বৃহস্পতিবার গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তার ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর লি ছিয়াংয়ের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গার্ড অব অনার প্রদান করে চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এসময় তার সঙ্গে ছিলেন। ছবি: পিএমও

তাদের উপস্থিতিতে বিনিয়োগ, গণমাধ্যম সহযোগিতাসহ ১৩টি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে দুই দেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে সেখানে ভোজসভার আয়োজন করেন লি ছিয়াং।

সেদিন সকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে আরেকটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। সবমিলিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

বেইজিং সফরের শেষ দিনে স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ১১টায় গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ মিনিটের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বসে। এর পরপরই দুই নেতার মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।

শুক্রবার প্রকাশিত ১৫ দফার এই যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, দুই দেশ তাদের ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নিয়ে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তুলবে, যাতে দুই দেশের জনগণ আরও বেশি উপকৃত হয়।

বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা এবং দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর মত বিষয় যৌথ ঘোষণায় এসেছে।

এছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি; চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।

সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে ও তার সফরসঙ্গীদের প্রতি উষ্ণ ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য চীনের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নিয়ে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বলেন, “মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর ভালো হয়েছে বলেই আমরা মনে করছি। সময়টা খুব ভালো। তারপরে চীনের সাথে বাংলাদেশে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আছে।

“এই সফরের ফলে সেই সহযোগিতাগুলো নতুন নতুন মাত্রা পাবে। নতুন নতুন ক্ষেত্রে আরো সহযোগিতা হবার সম্ভাবনা বাড়বে।”

এরপর অন্য অংশীদার দেশের সঙ্গে সফর বিনিময়ের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারের পরে আস্তে আস্তে দেশের মধ্যে তার যে কাজ, লক্ষ্য, সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবেন তারা, সেগুলো যখন গুছিয়ে নেবেন সাথে সাথে বিভিন্ন দেশের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশ, যেগুলো সবার সাথেই আদানপ্রদান হবে, আসা-যাওয়া হবে। কখনও আমাদের প্রধানমন্ত্রী আগে যাবেন, কখনও সে দেশ থেকে লোকজন আসবে।”

‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর’

যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব আবারো সামনে এনেছে বেইজিং।

শুক্রবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই নেতার বৈঠকে ‘কানেক্টিভিটি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

“সেখানে প্রস্তাব এসেছে, কীভাবে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডোর তৈরি করা যায়, যে ইকোনমিক করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, ইকোনমিক ট্রানজেকশন বাড়ানো এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরো এনহ্যান্স করা।”

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোরের ধারণা নতুন কিছু নয়। এটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অধীন একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হল চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত সংযোগ স্থাপন।

কিন্তু চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ নিয়ে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে পরবর্তীতে বিসিআইএম প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে।

এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান ‘চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর’ সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। মূলত এটিই এখন সম্ভাব্য ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

এই করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

এই সংযোগটি পরে সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে চীনের।

বলা হচ্ছে, এ করিডোর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি যোগাযোগ ও লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠার ফলে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এই করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। চীনের ভাষ্য, রাখাইনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে সেখানকার জাতিগত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসবে।

বিশ্লেষক ও গবেষকদের আলোচনায় এমন করিডোরের বিষয় সবসময় থাকার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক লাইলুফার বলেন, সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় মেরিটাইম ডায়ালগে গিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে ‘কানেক্টিভিটি’ নিয়ে আলোচনা হয়।

“ওই জিনিসটাই আমি দেখলাম যে, এবার কথা হয়েছে। যেটা নিয়ে আমরা হয়তো অ্যাকাডেমিক লেভেলে অনেকবারই বলেছি। এটা একটা ‘মেজর ডেভলপমেন্ট’ আমি বলব।”

এর সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও সম্পর্কিত হওয়ার কথা তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, “এক্ষেত্রে যেটা মনে হচ্ছে যে, যদি বাংলাদেশ-মায়ানমার-চায়না একটা রোড প্রপোজ করা হয় এবং তার মানে এটা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ রয়েছে।”

এক্ষেত্রে চীনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মিয়ানমারের যোগাযোগ পুনরায় শুরুর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সুতরাং আমি দুইটাকে অনেক বড় উন্নতি হিসাবে দেখছি। যেটা যাবার আগে কিন্তু ‘পলিসি মেকিং লেভেল’ বা অন্য কোনো পর্যায়ে আলোচনা হয়নি। এটা একটা ‘মেজর ডেভলপমেন্ট’ আমি বলব।”

অধ্যাপক লাইলুফার বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, চায়না বাংলাদেশের জন্য একটা ‘স্ট্র্যাটেজিক অপরচুনিটি’ দিচ্ছে ‘টু বাইপাস ইন্ডিয়ান টেরিটরি’। এইজন্য আমার কাছে মনে হয়েছে, যে এটা একটা ‘সিগনিফিকেন্ট’।

“এবং ইকোনমিক গুরুত্বতো আছেই। কারণ এটা শুধুমাত্র মায়ানমার এবং চায়না নয়, এটা ‘গ্র্যাজুয়ালি’ আমরা এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারব।”

রাখাইন রাজ্যে যে বাস্তবতা, তা বিবেচনায় নিলে সেক্ষেত্রে অগ্রগতির সম্ভাবনা কতটুকু, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অগ্রগতির সম্ভাবনা আছে বলেই চীন প্রস্তাব করেছে। এটা আপনাকে বুঝতে হবে। অগ্রগতির সম্ভাবনা না থাকলে চীন প্রস্তাব করত না।”

তবে, অর্থনৈতিক করিডোররকে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে আগে থেকে ভাবার পরামর্শ দেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, “একটা দুঃখের বিষয়, এটা অতীতেও হয়েছে, বিভিন্ন রকমের অঙ্গীকার করা হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু বাস্তবায়ন করা হয় না। করলেও সেগুলোকে আমরা ঠিক মতন অনেক সময় ব্যবহার করি না।

“যেসব প্রকল্প এখানে তৈরি হয় চীনের সাহায্যে বা অন্য বিদেশি সাহায্যে, সেগুলোকে ঠিক মতন টিকিয়ে রাখা, সেগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। সেখানে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা অর্জন করা দরকার। তবে, সেটার ব্যাপারেও চীন আমাদেরকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবে।”


বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শুক্রবার বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। ছবি: পিএমও

‘টু প্লাস টু বেশ তাৎপর্যপূর্ণ’

বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটার বড় অংশ চীন থেকেই আসে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত সহযোগিতাও রয়েছে।

কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার যাত্রায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার কাঠামোগত প্রক্রিয়া তৈরির উপায় অনুসন্ধানের কথা বলেছে ঢাকা ও বেইজিং।

‘টু প্লাস টু’ নামে পরিচিতি এ কাঠামোগত প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া এবং কম্বোডিয়ার সঙ্গে তৈরি করেছে চীন। আর একই ধরনের প্রক্রিয়ার কথা চলতি মাসে বলেছে তুরস্ক ও বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন বলেন, “ফরেন এবং ডিফেন্স—এই দুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ‘ফর দ্য ফার্স্ট টাইম’ বাংলাদেশের সাথে চায়নার ‘টু প্লাস টু’ একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। যেখানে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি যারা রয়েছেন, ওনাদের নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে সংলাপ শুরু হবে। এই ‘ইন্স্ট্রুমেন্টের ডিটেইলস’টা ‘ওয়ার্কআউট’ করা হচ্ছে।

“বাংলাদেশের সভরেন্টি বা সার্বভৌমত্ব ইন্ডিপেন্ডেন্স বা স্বাধীনতা এবং ‘টেরিটরি ইন্টিগ্রিটি’কে সম্মান জানিয়ে চীন বলেছে, গণতন্ত্র ব্যবস্থায় বাংলাদেশে যেভাবে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে একটি সরকারের, যেটির পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বহিঃপ্রকাশ, সেটি নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশও চায় যেমন স্বাধীন সার্বভৌম থাকতে, চীনও চায় তার মতো করে স্বাধীন সার্বভৌমভাবে দেশ পরিচালনা করতে। এটা একটা ‘গ্লোবাল ভ্যালু’, যেটা আমরা ‘হোল্ড’ করতে চাচ্ছি।”

এটাকে সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসাবে অভিহিত করে অধ্যাপক লাইলুফার বলেন, “আমি বলব যে এই ‘টু প্লাস টু ফর্মুলা’টা তখনই ‘অ্যাপ্লাই’ করা হয়, যখন একটা রাষ্ট্রকে আমরা সেইভাবে করে তার কৌশলগত তাৎপর্য আছে, সেই জিনিসটা বুঝতে পারি।”

তিনি বলেন, “যখন একটা দেশের কৌশলগত গুরুত্বটাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং একটা দেশ জানে যে, আমি আরেকটা দেশের সাথে কোঅপারেট করলে একটা ‘উইন-উইন সিচুয়েশন ক্রিয়েট’ হবে, দুইটা দেশের জন্যই, তখন করা হয়।

“সেইজন্য আপনি দেখবেন যে, চীন তার অঞ্চলের দেশ থেকে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ‘অফিশিয়ালি সাউথ এশিয়া’তে না হলেও কিন্তু ১০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বে এবং বাংলাদেশের আরেকটা জিনিস আমার লেখাটা আমি যেটা দিচ্ছি যে, ‘বে অফ বেঙ্গল’, বাংলাদেশের উপসাগর, সেখানে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বটা চীনসহ অন্যান্য দেশ ধরতে পারছে এবং সেটা আরেকটা বড় কারণ।”

কৌশলগত অবস্থানের কারণে জাপানের ‘ওভারসিস সিকিউরিটি কোঅপারেশন এগ্রিমেন্টে’ও বাংলাদেশ থাকার কথা তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, “এখানে অনেকেই অনেকটা না বুঝে বারবার বলার চেষ্টা করেন যে, বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব নাই।

“কিন্তু বাংলাদেশের যে ‘অর্গানিক স্ট্রাটেজিক সিগনিফিকেন্স’ আছে, ‘ন্যাচারাল স্ট্রাটেজিক সিগনিফিকেন্স’ আছে, সেটা আমরা বারবার দেখছি যে অন্য রাষ্ট্রগুলো আমাদেরকে এটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের ভেতর থেকে সচেতনতা নাই।”


চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ‘মনুমেন্ট টু দ্য পিপলস হিরোস’-এ শুক্রবার শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিস্তা প্রকল্প

প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি।

এতে বলা হয়েছে, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে দুই দেশ।

চীন জানিয়েছে, নিজেদের ‘সক্ষমতা অনুযায়ী’ তারা তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা করবে এবং প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা দেবে।

এ ছাড়া সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।

তিস্তা প্রকল্পে বড় রকমের কোনো অগ্রগতি না হলেও এর বাস্তবায়ন চীনের হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার কথা তুলে ধরে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ বলেন, “এটা তো এর মধ্যে নতুন কিছু পাচ্ছে না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে আমাদের তিস্তা প্রকল্প যদি হয়, তাহলে চীনকে নিয়েই আমরা করব, এটাই স্বাভাবিক।

“ওদের সেই অভিজ্ঞতা আছে, ওদের সেই দক্ষতা আছে এবং আমাদের সরকার চাচ্ছে সেটা করতে। কিন্তু এইবারে কোনো রকমের চুক্তি করে নাই, এ ব্যাপারে এটুকু বোঝা যাচ্ছে।”

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিল।

মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়।

নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি।

ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ শীর্ষক এ প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ সরকার।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে এটিসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছেন বলে ওই সময় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।

তিস্তা প্রকল্পে নদীর তীর ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে সেসময় এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বিবিসি।

এ প্রকল্পে চীনা কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকাকে নয়া দিল্লির উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়।

এর মধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।

এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ অগাস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যান তিনি।

২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

Manual5 Ad Code

পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম ধাপের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা (৭৫০ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চীনের কাছে ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে এবং বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হবে।

Manual6 Ad Code

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে চীনের সঙ্গে প্রকল্পটির বিষয়ে সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা হল।

তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের ‘উদ্বেগের’ প্রসঙ্গে শুক্রবার এক প্রশ্নে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত আছে চীন। এক্ষেত্রে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চায়।

তিনি বলেন, “জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে কী করা যায়, তার জন্য প্রস্তুত আছে চীন।

“আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটা তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ মুক্ত থাকা উচিত।”তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর