কী, কেন, কীভাবে; ইরানে আবারও মার্কিন হামলা, তবে কি ভেস্তে যাচ্ছে যুদ্ধবিরতি
কী, কেন, কীভাবে; ইরানে আবারও মার্কিন হামলা, তবে কি ভেস্তে যাচ্ছে যুদ্ধবিরতি
editor
প্রকাশিত মে ২৬, ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ণ
Manual6 Ad Code
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
Manual8 Ad Code
একদিকে যখন মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কাতারের দোহায় আলোচনা অংশ নিতে ইরানের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল অবস্থান করছে, ঠিক তখনই হরমোজ প্রণালির কাছে সিরিজ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, মার্কিন সেনাদের হুমকি থেকে রক্ষা করতে তারা এই ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান ও বিস্তারিত তথ্য তারা প্রকাশ করেনি। এদিকে ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, হরমোজ প্রণালি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার (৪২ মাইল) দূরে দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস এলাকায় ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
যা বলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
সেন্টকমের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, সোমবার শেষরাতের এই হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন স্থাপনের চেষ্টায় থাকা ইরানি নৌকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নিজেদের সেনাদের রক্ষা করতে সংযম বজায় রেখে আত্মরক্ষা করে যাচ্ছে।
Manual7 Ad Code
বর্তমানে ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, হরমোজ প্রণালির কাছে ইরানের সামরিক বাহিনী মাইন স্থাপন করছে বলে ওয়াশিংটন অভিযোগ তুলেছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ভারতের জয়পুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুবিও সতর্ক করে বলেন, যেভাবেই হোক হরমোজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতেই হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত হতে ‘কয়েক দিন সময় লাগতে পারে’।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ইরানের সাথে আলোচনা ‘ভালোভাবেই’ চলছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আরও বড় হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, হলে সবার জন্য একটি চমৎকার চুক্তি হবে, অন্যথায় কোনও চুক্তিই হবে না, আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যেতে হবে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও আইআরজিসির দাবি
বন্দর আব্বাসে মার্কিন হামলার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরানি আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন বিমানের অনুপ্রবেশ চিহ্নিত করার পর তারা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এছাড়া একটি আরকিউ-৪ ড্রোন এবং একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে।
Manual7 Ad Code
আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত বা প্রতিশোধ নেওয়ার ‘বৈধ ও নিশ্চিত’ অধিকার তাদের রয়েছে। আল জাজিরার সূত্রমতে, মার্কিন হামলার আগে আইআরজিসি সাগরে একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং বন্দর আব্বাসে মার্কিন হামলায় বেশ কয়েকজন আইআরজিসি কর্মী নিহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর দাবি এখনই করা যাচ্ছে না। এছাড়া এই মুহূর্তে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনও আলোচনা হচ্ছে না, তাদের মূল লক্ষ্য যুদ্ধ অবসান।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও স্থায়ী শান্তি এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এরই মধ্যে কাতারের দোহায় পৌঁছেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মতির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।
ট্রাম্প এই শান্তি আলোচনার সাথে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যুক্ত করার শর্ত জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যার মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি জড়িত। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।
শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সিনিয়র অ্যাডভাইজার মার্ক ক্যানসিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, মার্কিন এই হামলাটি ছিল সীমিত। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সিএসইএস-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর মোনা ইয়াকুবিয়ান জানান, যেহেতু ইরান প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে, তাই এই হামলা শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে। আল জাজিরার ওয়াশিংটন প্রতিনিধি অ্যালান ফিশারও মনে করেন, এই সংঘাতের ফলে যুদ্ধ অবসানের চলমান আলোচনা লাইনচ্যুত হওয়ার বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।