আজ বৃহস্পতিবার, ১২ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংবিধান সংস্কার পরিষদ: বিএনপি শপথ না নেওয়ায় রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়বে?

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ণ
সংবিধান সংস্কার পরিষদ: বিএনপি শপথ না নেওয়ায় রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়বে?

Manual2 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভার শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি বিএনপি। অপরদিকে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা এই শপথ নিয়েছেন। বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের এই পক্ষে-বিপক্ষের অবস্থানকে কেন্দ্র করে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রথমে এ বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের মন্তব্য ঘিরে। তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না।’’

এরপর থেকেই প্রধান বিরোধী দল জামায়াত ও তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর প্রতিবাদ জানায়। তাদের অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে শহীদদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে।

আর বিএনপির যুক্তি, তারা নির্বাচনের ইশতেহারেই বলেছে— এ ধরনের শপথ তারা নেবে না।

এ নিয়ে বিতর্কে জামায়াত ও এনসিপি প্রথমে ঘোষণা দেয়, বিএনপি নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তারাও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। এনসিপির শীর্ষ নেতারা ফেসবুকে বিএনপির বিরুদ্ধে তীর্যক মন্তব্য করতে থাকেন।

তবে দুপুরে নিজেদের বৈঠকের পরক্ষণেই তারা শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য সিইসির কাছে তারা একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথগ্রহণ করেন।

বিলম্বে আসায় জামায়াত ও এনসিপির সদস্যদের সঙ্গেই শপথ নেন বিএনপির ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ শুরু হলে ইশরাক ও রুমিন বের হয়ে যান। এ নিয়েও নানা আলোচনা হচ্ছে।

একপক্ষ বলছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। তাই সংস্কারের পক্ষে জনগণ মত দিয়েছে। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার স্বীকৃতিতে গণভোট আদেশ জারি করা হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জনগণের সা‍র্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার–সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে।’ অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত করার মাধ্যমে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করেছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল কাইয়ুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি প্রথম দিনেই জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে একটি দুর্ভাগ্যজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। এটি হতাশাজনক। কারণ তারা যে অজুহাতের কথা বলছে, তা যুক্তিযুক্ত নয়। রাষ্ট্রপতির আদেশেই তো গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। এখন যদি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারা শপথ নিয়ে থাকে, তাহলে সেই আদেশে হওয়া গণভোটের ম্যান্ডেটও তাদের মেনে নেওয়া উচিত। না হলে জুলাই সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।’’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, বিএনপি এখনও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তা না হলে এ নিয়ে নতুন করে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে।’’

বিতর্কের শুরু যেভাবে

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ ইস্যুতে প্রথম বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের মন্তব্য ঘিরে। সকালে সংসদ ভবনে শপথ নেওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে। কারণ, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। তাই তারা শপথ নেবেন না।’’ তিনি বলেন, ‘‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে— সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরকে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম থাকলেও আমরা (বিএনপি) কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। এছাড়া সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি।’’

সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিধান সংবিধানে নেই। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি, সামনের দিনেও চলবো।’’

তবে তার এ বক্তব্যের পর থেকেই জামায়াত ও এনসিপি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

Manual1 Ad Code

দুই শপথই নিলো বিরোধী দল, বের হয়ে গেলেন রুমিন-ইশরাক

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয়ে অনড় অবস্থানের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান জামায়াত ও এনসিপি জোটের নেতারা। সেখানে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠক করেন শীর্ষ নেতারা।

এর আগে দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে তারাও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না।

পরক্ষণেই নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এমন স্ট্যাটাস দেন জোটের আরেক শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘আইন অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায়— কোনও শপথ নেবে না ১১ দলীয় জোট।’’

একই কথা জানান, দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসন থেকে নির্বাচিত আব্দুল হান্নান মাসউদ।

তবে ১১ দলীয় জোটের বৈঠকের পর হান্নান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানান, তারা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ উভয় শপথই নিতে যাচ্ছেন।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, জনরায়ের সাথে প্রতারণামূলক অবস্থান নেওয়ায় প্রতিবাদস্বরূপ গঠিত হতে যাওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১১দলীয় জোট।

সর্বশেষ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে একই স্ট্যাটাস দেন দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন।

তিনি বলেন, আকাঙ্ক্ষা ও জনরায়ের প্রতি সম্মান জানাতে সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ সংসদ সদস্য হিসেবে পর পর দুইটি শপথ নিচ্ছেন এনসিপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। সে অনুযায়ী তারা দুইটি শপথ নিয়েছেন। তবে প্রতিবাদ স্বরূপ মন্ত্রিসভার শপথে যোগ দেননি।

অপরদিকে বিলম্বে আসায় জামায়াতের সংসদ সদস্যের সঙ্গেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিএনপির ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। যদিও বিরোধী দলের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় সেখান থেকে বের হয়ে যান এই দুই এমপি।

কী বলছেন রাজনীতিবিদরা?

Manual3 Ad Code

গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দুই ধরনের মত দিয়েছেন রাজনীতিবিদরা। একপক্ষ বলছেন, বিএনপির সিদ্ধান্ত ঠিকই আছে। আরেকপক্ষের দাবি, এতে করে জুলাই শহীদদের প্রতি বেইমানি করা হয়েছে। জনগণ সুযোগ পেলে এর সমুচিত জবাব দেবে।

এ বিষয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব জয়নাল আবেদী শিশির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে চব্বিশের শহীদদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। এটা এক ধরনের প্রতারণা। কারণ সাংবিধানিক আদেশে যেমন গণভোট হয়েছে, তেমনই জাতীয় নির্বাচনও হয়েছে। তাই জাতীয় নির্বাচন মানলে গণভোটের আদেশও মানতে হবে। অন্যথায়, আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে পারি।’’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘বিএনপি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক হয়েছে। কারণ এটি সংবিধানে নেই। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২(ক) ধারায় স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার শপথ পাঠ করাতে অপারগ হলে বা অনুপস্থিত থাকলে, তিন দিনের মধ্যে তাদের মনোনীত প্রতিনিধি শপথ পড়াবেন। সেটিও না হলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে শপথ পাঠ করাবেন। সেই বিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পড়িয়েছেন। সেটি ঠিক আছে।’’

Manual8 Ad Code

তিনি বলেন, ‘‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ প্রশ্নে বিএনপির সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরাও একমত। আমরাও বলেছি, সংবিধান সংশোধন করে আইন সংশোধন করেই শুধুমাত্র এ সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। বিএনপি তো এ ব্যাপারে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। তাদের ইশতেহারেও বিষয়টি উল্লেখ ছিল। আমরা মনে করি, জামায়াত ও এনসিপি এই নিয়ে অহেতুক জল ঘোলা করার চেষ্টা করছে। তবে এগুলো করে কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না।’’

তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিবিউন

Manual2 Ad Code