আজ মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্যপ্রাণীর অকৃত্রিম বন্ধু সিতেশ রঞ্জন দেব আর নেই

editor
প্রকাশিত জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ণ
বন্যপ্রাণীর অকৃত্রিম বন্ধু সিতেশ রঞ্জন দেব আর নেই

Manual3 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান প্রকৃতিপ্রেমী সিতেশ রঞ্জন দেব আর নেই।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভার রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

পরিবার জানায়, কয়েকদিন ধরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেলেন। সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি তিন ছেলে, চার পুত্রবধূ, চার কন্যা, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

Manual6 Ad Code

হাসপাতাল থেকে সিতেশ রঞ্জনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার বিচরণক্ষেত্র বাংলাদেশ বণ্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে অবস্থানরত আহত প্রাণীদের সামনে। সেখানে তাকে একনজর দেখতে ছুটে যান শত শত মানুষ।

 


সেখান থেকে বিকাল ৩টায় শ্রীমঙ্গলের নোওয়াগাঁওয়ে তার পৈত্রিক বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আবারও তাকে শ্রদ্ধা জানান গ্রামবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সেখানেই পারিবারিক শ্মশান ঘাটে তার শেষকৃত্য হওয়ার কথা রয়েছে।

তার মৃত্যুতে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান তার মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

 

এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেস ক্লাব, শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাব, শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরিবেশবাদী সংগঠন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা শোক প্রকাশ করেন।

তারা বলেন, তার মৃত্যু দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি হরিপদ রায় বলেন, “সিতেশ বাবুর মত মানুষ যুগে যুগে জন্ম নেন না। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য। তার চলে যাওয়া শুধু শ্রীমঙ্গলের নয়, পুরো দেশের অপূরণীয় ক্ষতি।”

শ্রীমঙ্গল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা একরামুল কবির বলেন, “যে মানুষটির স্নেহ-ভালোবাসায় প্রতিদিন মুখর থাকত অসংখ্য উদ্ধার করা পশু-পাখি, সেই অভিভাবককে হারিয়ে যেন তারাও নিস্তেজ। খাঁচায় বন্দি কিংবা চিকিৎসাধীন প্রাণীগুলোর চোখেও যেন খুঁজে ফেরার আকুতি। সেই সিতেশ বাবু নিজের সন্তানের মতোই তাদের সেবা-যত্ন করতেন।”

শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, সিতেশ রঞ্জনের বাবাও ছিলেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী। স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই তার বাবা বাড়িতে বিভিন্ন প্রাণী এনে লালন-পালন করতেন। সেখান থেকেই প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধের বীজ রোপিত হয় তার।

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, পরবর্তীকালে বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের নিষ্ঠুরতায় বন্যপ্রাণীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। সেসময় তিনি হয়ে ওঠেন বন্যপ্রাণীর আশ্রয়দাতা। নিজের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আহত, অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে নিবেদিত ছিলেন।”

Manual2 Ad Code

ভাল্লুকের থাবায় বদলে যাওয়া জীবন

১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে পাত্রখলা চা বাগানে বন্য শুকর তাড়াতে গিয়ে বিশাল এক ভারতীয় ভাল্লুকের আক্রমণের শিকার হন তিনি। ভাল্লুকের থাবায় একটি চোখ, নাক, গাল ও মুখের একাংশ এবং দাঁত হারান। মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে একাধিক প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তিনি নতুন জীবন ফিরে পান।

নিজেই বলতেন, “এটি আমার দ্বিতীয় জীবন।” সেই দ্বিতীয় জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বন্যপ্রাণীর সেবায়।

হাজারো প্রাণীর জীবনদাতা

চার দশকে তিনি হাজার হাজার বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লজ্জাবতী বানর, অজগর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, চশমা পরা হনুমান, বন্য শুকর, ঈগল, তক্ষক, বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ অসংখ্য প্রাণী তার সেবায় নতুন জীবন পেয়েছে।

শ্রীমঙ্গলে তার বাড়ি একসময় মানুষের কাছে ‘মিনি চিড়িয়াখানা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু সেটি ছিল প্রকৃতপক্ষে আহত ও অসহায় বন্যপ্রাণীর একটি আশ্রয়কেন্দ্র।

Manual8 Ad Code

অর্থকষ্টের মধ্যেও থামেননি

প্রাণীদের খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় মেটাতে তাকে নিজের মাছের খামারের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হত। অনেক সময় অর্থসংকটে পড়েও তিনি প্রাণীদের সেবা বন্ধ করেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের পরামর্শে ২০১১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এরপর তার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। অসংখ্য প্রাণী চিকিৎসা শেষে লাউয়াছড়া বনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়। তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর