আজ মঙ্গলবার, ২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অমোঘ সমর্পণ: জীবনের উপহার ও কবিতার মর্যাদা

editor
প্রকাশিত মার্চ ৩১, ২০২৬, ০১:১২ পূর্বাহ্ণ
অমোঘ সমর্পণ: জীবনের উপহার ও কবিতার মর্যাদা

Manual4 Ad Code

এইচ বি রিতা,

Manual7 Ad Code

কবিতা কি একটি সচেতন কারিগরি, নাকি এক পরম মুহূর্তের আকস্মিক প্রসাদ? এই বিতর্ক সাহিত্যের আঙিনায় চিরকালীন। কিন্তু প্রকৃত কবি এই দ্বান্দ্বিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। কারণ, বিতর্কের জন্ম হয় যেখানে দ্বৈততা বিদ্যমান—স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে যেখানে একটি যোজনব্যাপী ব্যবধান থাকে। কবির কাছে কবিতা এক অদ্বৈত সত্য। সেখানে শিল্পী আর শিল্পের মধ্যে কোনো কৃত্রিম বিভাজনরেখা থাকে না; থাকে কেবল এক অমোঘ ও আত্যন্তিক সমর্পণ। কবির নিকট কবিতা কোনো সুদূরপরাহত নক্ষত্র নয় যাকে দূরবীন দিয়ে খুঁজে নিতে হয়, কিংবা যা কোনো অলীক কল্পলোক থেকে নেমে আসা কোনো জ্যোতিষ্ক। বরং কবিতা হলো সেই অনির্বচনীয় মুহূর্ত, যা প্রাত্যহিক অসংগতির রুক্ষ ভিড়ে, কোনো এক পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় অতর্কিতে কবির অস্তিত্বের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে। এটি কোনো সচেতন বৌদ্ধিক কসরত বা মস্তিস্কপ্রসূত কুশলতা নয়; বরং জীবন যখন তার সমস্ত জটিলতা, কুশ্রীতা আর কর্কশতা নিয়ে অস্তিত্বের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়, তখনই সেই রুদ্ধশ্বাস সংকট থেকে জন্ম নেয় একটি অবিনশ্বর পঙ্ক্তি। সেটি কবির কর্ষণ নয়, সেটি জীবনের এক অবাধ্য ও অলঙ্ঘনীয় উপহার।

“অকস্মাৎ বাতাসের চাবুক যেমন লাগে গায়,

Manual1 Ad Code

কবিতা তেমন নামে অস্তিত্বের রুদ্ধ জানালায়।

শিল্পী তো কেউ নয়, সে কেবল দগ্ধ এক আঁধার—

জীবন যখন দেয় উপহার, খুলে যায় সব দ্বার।”

প্রকৃত কবির কলমে কবিতার চলন কোনো পরিকল্পিত ছন্দমিল কিংবা অলঙ্কারশাস্ত্রের ব্যাকরণসিদ্ধ প্রকরণ নয়, বরং তা এক আদিম ও অদম্য স্রোতের মতো। কবিতা কোনো অর্জিত মুকুট নয়, বরং তা এক পবিত্র দহন যা আত্মাকে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে। বর্তমান এই পণ্যজটিল ও যন্ত্রচালিত পৃথিবীতে, যেখানে মানুষের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসও বাজারের অদৃশ্য দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়, সেখানে কবিতা নির্মাণ নয়, বরং কবিতার ‘আবির্ভাব’ এক প্রকারের অস্তিত্বিক লড়াই। এই পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে যখন কবি প্রত্যক্ষ করেন এক নিরন্ন মানুষের আর্তনাদ যান্ত্রিক কোলাহলে নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তখন সেই মহা-স্তব্ধতাই কবির কলমের অবিনাশী কালি হয়ে ওঠে।

যখন এই সমাজের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে একজন সাধারণ মানুষের কণ্ঠনালী রুদ্ধ হয়ে আসে, তখন কবির ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা আর বাইরের সেই সামষ্টিক হাহাকার—এই দুই বিপ্রতীপ স্রোত এক বিন্দুতে এসে আছড়ে পড়ে। কবির কলম তখন আর কেবল ব্যক্তিগত বিলাসিতার আধার থাকে না; তা হয়ে ওঠে সেই আর্তনাদের এক নিরবচ্ছিন্ন অনুবাদক। ব্যক্তিগত উপলব্ধি যখন সমাজের রুগ্ন বাস্তবতার সাথে হাত মেলায়, তখনই কবির অক্ষরেরা হয়ে ওঠে একেকটি দহনবিন্দু।

“পণ্য-সমুদ্রের তলে যেখানে নিশ্বাস হয়ে আসে ম্লান,

সেখানেই জন্ম নেয় মানুষের অব্যক্ত এক গান।

ব্যক্তি হাহাকার মেশে যখন জনসমুদ্রের নোনা জলে—

অবিনাশী বর্ণমালা তখন বিপ্লব হয়ে কথা বলে।”

কবি শব্দ খোঁজেন না, বরং শব্দরাই কবিকে আক্রমণ করে। এই আক্রমণাত্মক সৃজনশীলতা কবির অহংকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। শব্দরা যখন কবিকে বাধ্য করে সেই ‘বিচারহীন কাঠগড়া’র সাক্ষী হতে, তখন শিল্পী অনুভব করেন তাঁর প্রধান ধর্ম- সত্যের মুখোমুখি হওয়া। পৃথিবী যখন তার স্বকীয় আলোকচ্ছটা হারিয়ে এক নিশ্ছিদ্র তিমিরের জঠরে প্রবেশ করে, তখন কবিতা কোনো শৌখিন বিলাসিতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে সেই অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক অকৃত্রিম ও নগ্ন সত্য। কবির কলমের ডগায় তখন যে ভাষাটি উছলে ওঠে, তা কোনো অলীক কল্পনা নয়—তা হলো সেই আঁধারের বুক চিরে সংগৃহীত এক রূঢ় বাস্তবতা। এই ‘বিচারহীন কাঠগড়া’ কোনো সাধারণ বিচারালয় নয়; এটি সেই স্থান যেখানে সময় নিজেই আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে দাঁড়িয়ে কবির শব্দগুলো হয়ে ওঠে একেকটি দহনবিন্দু, যা কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না, বরং এক প্রদীপ্ত যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

“আমি তো খুঁজি না শব্দ, শব্দই আমাকে ধরেছে কষে,

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি বিরামহীন বিচারহীন দোষে।

সত্য যেখানে নগ্ন, কল্পনা সেখানে বড়ই লাজুক—

কবিতার আঁচড়ে বিদীর্ণ হয় পৃথিবীর পাষাণ বুক।”

কবিতা যখন কবির কাছে নিঃশব্দে উপনীত হয়, তখন সে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা বহন করে আনে। সেই শব্দহীনতার গভীরে প্রোথিত থাকে এক গভীর বৌদ্ধিক গূঢ়তা। পুঁজিবাদের এই নব্য-সাম্রাজ্যবাদী যুগে মানুষের সংবেদনশীলতা যখন ক্রমশ ভোঁতা ও যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে, তখন কবিতা এসে সেই প্রসুপ্ত চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করে। এটি এক প্রকারের ‘অ্যালিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে মুক্তির লড়াই। কবি কেবল সেই সন্ধিক্ষণের প্রতীক্ষা করেন, যখন জীবন তার সমস্ত অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তি আর অসংগতি নিয়ে সামনে এক বিশাল প্রশ্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সেই রিক্ততাই শ্রেষ্ঠ কবিতা। কবির ব্রত হলো কেবল সেই উপহারটিকে পরম শ্রদ্ধায় ও মমতায় মূল্যায়ন করা, যাতে তার অন্তর্নিহিত তেজটুকু নির্বাপিত না হয়। এই মর্ত্যলোকে আলো হয়তো সাময়িকভাবে অপসৃত হতে পারে, কিন্তু কবিতার যে স্বয়ংপ্রভ অগ্নি—তা কোনোদিনও নেভে না।

ভবিষ্যৎ যখন এই কালখণ্ডকে ব্যবচ্ছেদ করবে, তখন তারা শৈল্পিক চাতুর্য বা শব্দশৈলীর নিপুণতা বিচার করবে না; বরং তারা সন্ধান করবে কবি কতটা সততা ও সাহসের সাথে এই আর্তনাদকে অক্ষরের আধারে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। কবিতার মর্যাদা রক্ষা করা মানে হলো সেই পরম আবেগকে কোনো বিকৃতির গ্রাস থেকে রক্ষা করা। যখন বলা হয় ‘কবিতা কবিকে খুঁজে ফেরে’, তখন আসলে এক বৃহত্তর ও অমোঘ শক্তির কাছে কবির নিজ সত্তার বিসর্জন ঘটে। মানুষ যখন তার বাচনিক সীমানার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, যেখানে কোনো অভিধানের শব্দ আর হাহাকারকে ধারণ করতে পারে না, সেখান থেকেই কবিতার প্রকৃত জয়যাত্রা শুরু হয়। সেই যাত্রায় কবি কেবল এক বিদেহী সহযাত্রী। জীবন যখন কবিকে সেই পঙ্ক্তিটি দান করে, তখন তিনি ঋণী হয়ে পড়েন সেই পরম অস্তিত্বের কাছে। আর সেই ঋণ পরিশোধের একমাত্র পথ হলো—কবিতার মর্যাদাকে জীবনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া। কবি সেই বিচারবীন কাঠগড়ার অতন্দ্র প্রহরী, যেখানে কবিতা নিজেই বিচারক, জীবনই একমাত্র সাক্ষী এবং কবির শব্দগুলো সেই বিচারের অবিনাশী নথিপত্র।

“ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদে টিকে থাকে সেই সাহসী রেখা,

যেখানে যন্ত্রণার কালিতে হয়েছে অস্তিত্বের দেখা।

জীবন যখন ঋণ হয়ে যায় পঙ্ক্তির বাঁকে বাঁকে—

কবি তখন মর্যাদা রক্ষা করে, নিজের রক্ত মাখে।”

পরিশেষে এ কথা বলা প্রয়োজন যে, এই লেখাটি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিলাসিতা নয়, বরং সমকালীন সময়ের এক রুদ্ধশ্বাস অস্থিরতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্রতিবাদ। যখন সত্যকে আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয় এবং শিল্পকে স্রেফ পণ্যে রূপান্তর করা হয়, তখন এই বিশ্বাসের কথাগুলো বলা জরুরি হয়ে পড়ে-যাতে আগামীর কবিরা বুঝতে পারেন কবিতা কেবল শব্দ সাজানো নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াই।

Manual8 Ad Code

ইতিহাসে দেখা গেছে, মহৎ কবিতার জন্ম সর্বদা এক প্রকার ‘আলোকিত দহন’ থেকে। গ্রিক দার্শনিকদের সেই ‘ডিভাইন ফিউরি’ বা ফরাসি কবি আর্থার র‍্যাঁবো-র সেই ‘দ্রষ্টা’ হওয়ার যে কঠোর সাধনা—তা প্রমাণ করে যে কবিকে শেষ পর্যন্ত সত্যের এক নির্জন ও বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে হয়। জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’—সেই ‘কেউ কেউ’ হওয়ার অর্থ হলো পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ও যান্ত্রিকতার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মাকে এক অবিনাশী সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা। এই লেখাও সেই ধ্রুপদী সত্যেরই পুনরুক্তি: কবিতা কেবল সুন্দরের উপাসনা নয়, বরং অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত মোমবাতি। আগামীর সেই ‘কেউ কেউ’ যেন এই দহনবিন্দু থেকেই খুঁজে পায় তাদের প্রকৃত দিশা।

এইচ বি রিতা,কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক,নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

Manual3 Ad Code