ভারতে পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ভোট গণণা ও ফলাফলের অপেক্ষা।
সোমবার (৪ মে) ভোট গণণা শুরু হবে। কিন্তু ভারতীয় বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমের কাছে অন্যান্য রাজ্যগুলোর তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ পাচ্ছে বেশি। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে জয় পেতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি বুথফেরত জরিপে এবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শাসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যদিও ২০২১ সালের বুথফেরত জরিপকে ভুল প্রমাণিত করে টানা তৃতীয়বার নির্বাচিত হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস।
সোমবার ভোট দিতে কে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে তেমনি অন্যান্য রাজ্যগুলোর তুলনায় কেন বাংলা ভাষাভাষীদের রাজ্যটি এবার গুরুত্ব পাচ্ছে সেটিও আলোচিত হচ্ছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিষয়ের শিক্ষক অপূর্বানন্দ দ্য হিন্দুতে এক বিশ্লেষণে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
Manual4 Ad Code
তিনি লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নতুন নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে? সম্ভবত এই প্রশ্নের চেয়ে এখন আমাদের এটি জিজ্ঞাসা করা উচিত: বাংলায় আসলে কার জেতা উচিত? এই মৌলিক প্রশ্নে যাওয়ার আগে আমাদের একটু ভাবা দরকার, দিল্লির বিশ্লেষক মহলের নজর কেন অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কেবল পশ্চিমবঙ্গের ওপরই এত বেশি নিবদ্ধ? সম্প্রতি কেরালা, তামিলনাড়ু, আসাম ও পুদুচেরিতেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সব আলোচনা ও বিতর্ক কেন কেবল পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে?
Manual7 Ad Code
এর একটি প্রধান কারণ হলো, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিজেপি এখনও ক্ষমতার প্রকৃত দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। তারা সেখানে অবশ্যই পূর্ণ শক্তি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়, তবে তাদের অবস্থান এখনও প্রান্তিক। সেখানকার ক্ষমতাসীন শক্তির বিরুদ্ধে বিজেপি এখনও বড় কোনও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি। ফলে দিল্লির রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের কাছে এই রাজ্যগুলোর তেমন কোনও ‘গুরুত্ব’ নেই। এর সঙ্গে আরেকটি সত্য জড়িয়ে রয়েছে, উত্তর ভারতীয়দের ভাবনায় ভারতের দক্ষিণাঞ্চল এখনও একরকম প্রান্তিক হয়েই আছে।
অন্যদিকে আসামের নির্বাচন নিয়ে দিল্লির বিশ্লেষকদের মধ্যে আগে থেকেই যেন একধরনের ঐক্যমত্য তৈরি হয়ে আছে। সেখানে আগ্রহের জায়গা কেবল একটিই, বিজেপি কি তাদের মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন করবে, নাকি হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আবার নেতৃত্বে ফিরবেন?
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। এবার বাংলাকে জয় করা বিজেপির জন্য এক মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যটি দখল করতে দলটি তাদের সর্বশক্তি ও সব ধরনের রসদ উজাড় করে দিয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এবং বিচার বিভাগও যেন বিজেপির পথের সব বাধা দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এমনকি অন্যান্য রাজ্য থেকে নির্বাচনি দায়িত্ব দিয়ে আনা প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও বিজেপির প্রতি এক স্পষ্ট পক্ষপাত লক্ষ্য করা গেছে।
Manual6 Ad Code
একইভাবে দিল্লির কর্পোরেট পুঁজির সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলায় গেরুয়া পতাকা উড়তে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। ২০২২ সালের নির্বাচনেও এই সংবাদমাধ্যমগুলো আগেভাগেই বিজেপির জয় ঘোষণা করে দিয়েছিল। যদিও সে সময়কার আসল ফলাফল তাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বড় এক চপেটাঘাত করেছিল। এবার তারা আশা করছে, নির্বাচন কমিশন এবং পুরো রাষ্ট্রীয় প্রশাসন মিলে অবশেষে তাদের সেই দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরণ করতে পারবে।
এই নির্বাচন যদি সাধারণ সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে অনুষ্ঠিত হতো এবং ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে যদি একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক বিকল্প থাকত, তবে জয়ের উত্তরটি হয়তো এত বিতর্কিত হতো না। তৃণমূল দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। ফলে দলটির সেই সতেজতা আর নেই। স্থানীয় নেতাদের আধিপত্য ও দাপট এখন লাগামহীন। দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা এখন প্রকাশ্য আলোচনার বিষয়। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জনগণ তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিল, তা পূরণে দলটি ব্যর্থ হয়েছে।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যখন বাম ফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে উপড়ে ফেলেছিল, তখন তাদের অপরাজেয় মনে হতো। বামপন্থিরা সে সময় প্রতিটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান দখল করে নিয়েছিল এবং রাজনৈতিক সহিংসতাই হয়ে উঠেছিল রাজনীতির প্রধান ভাষা। তৎকালীন ক্ষমতাসীন সিপিআই (এম)-এর ঔদ্ধত্য চরম আকার ধারণ করেছিল। এসবের মিলিত প্রভাবেই মানুষ যেকোনও মূল্যে বামপন্থিদের হাত থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
আজকের পরিস্থিতিও যেন সেই ফেলে আসা সময়ের মতোই এক ভুতুড়ে মিল বহন করছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল স্বাভাবিকই নয়, বরং যৌক্তিকও বটে। কিন্তু বাংলার দুর্ভাগ্য এখানেই যে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো অবস্থানে আজ কংগ্রেস কিংবা বাম ফ্রন্ট কেউই নেই। ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে সিপিআই (এম) যেন লড়াই করার মানসিকতাই হারিয়ে ফেলেছে। আর কংগ্রেস বহু আগেই বাংলা থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগেই কেবল বিজেপি একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে বিজেপির জয়কে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হতেই পারে। তবে আমাদের মতো মানুষেরা কেন জোর দিয়ে বলছেন যে, বাংলায় বিজেপির জয় হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়?
বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার জন্য কী ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা দলটির নির্বাচনি প্রচারণার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। যেভাবে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগ্নভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তা এক স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সংসদীয় বা সাংবিধানিক শিষ্টাচারের প্রতি দলটির কোনও শ্রদ্ধাবোধ নেই। এই ধরনের কোনও দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তারা রাজ্যের সম্পদকে জনগণের আমানত হিসেবে দেখে না। বরং প্রাচীনকালের রাজাদের মতো তারা সেগুলোকে নিজেদের ব্যক্তিগত জমিদারি বলে মনে করে।
এর পাশাপাশি, বিজেপির প্রচারণায় বাংলার মুসলমানদের সুনির্দিষ্টভাবে ‘অন্য দলভুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের দানবীয় রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের আস্থা অর্জনের কোনও চেষ্টাই করা হয়নি। উল্টো দলটির নেতারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, বিজেপির জয় হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক ‘অন্ধকার দিনের’ সূচনা। প্রতিটি প্রচারক মুসলমানদের হেয় করতে চরম উগ্র ও সহিংস ভাষা ব্যবহার করেছেন। উর্দুর সঙ্গে যুক্ত করে কিংবা বাংলাদেশের দোহাই দিয়ে মুসলমানদের ‘অবাঙালি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা চলেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার হুমকি দিয়েছেন যে, তারা প্রতিটি ‘অনুপ্রবেশকারীকে’ একে একে বহিষ্কার করবেন। এমন পরিস্থিতিতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মুসলমানদের ওপর তার কী প্রভাব পড়বে, তা ব্যাখ্যা করার কোনও প্রয়োজন নেই।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, সেখানেই মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা তীব্র হয়েছে এবং মুসলমানদের ওপর প্রতিদিনের সহিংসতা এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর সর্বশেষ প্রমাণ ওড়িশা। সেখানে বিজেপি প্রথমবারের মতো এককভাবে সরকার গঠন করার পর থেকেই রাজ্যের প্রতিটি কোণ থেকে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের খবর আসতে শুরু করেছে। রাস্তায়, বাসে, ট্রেনে এমনকি ঘরের ভেতরেও মুসলমানদের ওপর হামলা এখন নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে খ্রিস্টানদের ওপর চলা সহিংসতা তো এখন আর জনমানসে কোনও ভাবনাই তৈরি করে না।
এটি এক অস্বস্তিকর কিন্তু অনস্বীকার্য সত্য: বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের জীবন এক চরম অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মধ্যে কাটে। তারা পদ্ধতিগত বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হন এবং খুব ভালো করেই জানেন যে, রাষ্ট্র কখনোই তাদের পাশে দাঁড়াবে না। কেবল এই একটি কারণই যথেষ্ট যে কেন বাংলায় বিজেপির ক্ষমতায় আসা উচিত নয়।
অনেকের কাছে এই কারণটি পর্যাপ্ত মনে নাও হতে পারে। তারা প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, মুসলমানদের মর্যাদা ও সুরক্ষার বিষয়টি কি এতই বড় যে তার জন্য সরকারের পরিবর্তন আটকে দিতে হবে? যারা এই প্রশ্ন তোলেন, তারা আসলে উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশী। তবে গত এক দশকের তথ্য ও পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিশু মৃত্যুর হারের ক্ষেত্রে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো তামিলনাড়ু কিংবা কেরালার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি সহজে ব্যবসা করার রেকর্ডেও তাদের অবস্থান মোটেও সন্তোষজনক নয়।
বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে শিক্ষার মানের এক চরম অবনতি ঘটেছে। সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিগ্রি নেওয়া শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ও পেশাগত দুনিয়ায় প্রায়শই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণ করে। সেটি হলো, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বেদিতে কখনোই সামাজিক সম্প্রীতিকে বলি দেওয়া যায় না। কারণ সম্প্রীতি ছাড়া সমৃদ্ধি কখনোই টিকে থাকতে পারে না।
এর বাইরেও বিজেপি মূলত এক রাজতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে কাজ করে। তারা জনগণকে অধিকার সচেতন নাগরিক হিসেবে দেখে না; বরং মনে করে জনগণ হলো রাজার অনুগত ‘প্রজা’, যাদের প্রধান কাজ হলো রাজার প্রতি দায়িত্ব পালন করা। তাই বিষয়টি কেবল মুসলমানদের হেয় প্রতিপন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর ফলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষও নিজেদের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব হারায়।
বিজেপি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংসদীয় প্রক্রিয়াগুলোকে ভেতর থেকে অকার্যকর করে দেয়। তারা পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে ভারতের সংবিধানের পরিবর্তে তাদের দলীয় আদর্শের অধীনে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে এবং তারা তখন কেবল ‘রাজার’ মর্জির ওপর বেঁচে থাকে।
এসব সুনির্দিষ্ট কারণেই বিজেপি কখনোই তৃণমূলের ‘উন্নত বিকল্প’ হয়ে উঠতে পারে না। তবে এই লেখা যখন শেষ হচ্ছে, ততক্ষণে বাংলার রায় ইতোমধ্যে ব্যালট বাক্সে বন্দি হয়ে গেছে। এখন কেবল এটিই দেখার অপেক্ষা যে, বাংলা কি উত্তর প্রদেশ আর গুজরাটের পথ বেছে নেয়, নাকি নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করে নিজের মতো করে নিজস্ব পথ খুঁজে নেয়।