আজ বুধবার, ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢেলে সাজানো হচ্ছে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা

editor
প্রকাশিত মে ১৩, ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ
ঢেলে সাজানো হচ্ছে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘদিন ধরে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থায় থাকা অকেজো স্ক্যানার ও বিকল সিসিটিভি ক্যামেরার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং অবৈধ পণ্য বা বিপজ্জনক যন্ত্র নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সচিবালয়ের পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন এ ব্যবস্থার আওতায় সচিবালয়ে প্রবেশকারী যানবাহনে মাদক ও অস্ত্র শনাক্তে উন্নতমানের স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বসানো হবে এআইভিত্তিক আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা, যা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে।

নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে সচিবালয়ে প্রবেশের পাস ব্যবস্থাতেও আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, দর্শনার্থীদের জন্য ইস্যু করা পাস নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকর থাকবে। ফলে একজন কর্মকর্তা প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টার জন্য কোনো দর্শনার্থীকে পাস দিতে পারবেন। এতে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ কমার পাশাপাশি নিরাপত্তা নজরদারিও আরও কার্যকর হবে।

  • বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া সময়ের দাবি। দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো যন্ত্রপাতি ও দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এআইভিত্তিক ক্যামেরা, আধুনিক স্ক্যানার ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা চালু হলে শুধু নিরাপত্তাই জোরদার হবে না, সন্দেহজনক তৎপরতা দ্রুত শনাক্ত করাও সহজ হবে। তবে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

বাংলাদেশ সচিবালয়

গুরুত্বপূর্ণ ৯৯ স্থানে বসবে এআইভিত্তিক অত্যাধুনিক ক্যামেরা

সূত্র জানিয়েছে, সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে সচিবালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৯৯টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অত্যাধুনিক ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্তকরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। পাশাপাশি এসব ক্যামেরায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ছবি তুলে সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে প্রেরণ করে ডেটা সংরক্ষণ করবে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের গতিবিধি শনাক্ত হলে ওই ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে আনা হবে।

বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক স্ক্যানার; কেনা হচ্ছে ওয়্যারলেস সেটও

সূত্র জানিয়েছে, সচিবালয়ের এই নিরাপত্তাকাঠামো জোরদার করতে সচিবালয়ের প্রবেশের ৪টি গেটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন আধুনিক ব্যাগেজ স্ক্যানার এবং আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রবেশপথে আগত ব্যক্তি ও বহনকৃত সামগ্রী দ্রুত ও নির্ভুলভাবে স্ক্যান করা সম্ভব হবে। শনাক্ত করা যাবে মাদক ও ছোট অস্ত্রও। পাশাপাশি সচিবালয়ের যানবাহন প্রবেশপথে অত্যাধুনিক ভেহিক্যাল স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রবেশরত যানবাহন, তাতে অবস্থানরত ব্যক্তি এবং বহনকৃত সামগ্রী দ্রুত ও নির্ভুলভাবে স্ক্যান করা সম্ভব হবে। কোনো যানবাহনে অনাকাঙ্ক্ষিত বা সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত হওয়া মাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম সক্রিয় হবে এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহনের প্রবেশ তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

Manual2 Ad Code

সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা, হচ্ছে যাচাই-বাছাই

সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের পাস ইস্যু নিয়ে নতুন নির্দেশনা
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে যানবাহন ব্যবস্থাপনাতেও যুক্ত হয়েছে ‘আরএফআইডি’ প্রযুক্তি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত যানবাহনে আরএফআইডি স্টিকার সংযুক্ত করা হয়েছে, যা ‘লং রেঞ্জ আরএফআইডি রিডার’-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হয়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করবে। এর ফলে সমন্বিত এই ব্যবস্থা নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া সচিবালয়ে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় ও দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নতুন আধুনিক ওয়্যারলেস সেটও ক্রয় করা হয়েছে। এর ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ আরও সহজ হবে।

Manual8 Ad Code

অস্থায়ী পাসও হচ্ছে ডিজিটাল

ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি বলছে, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে সচিবালয়ের অ্যাকসেস কন্ট্রোল সিস্টেমেও আনা হয়েছে আধুনিকায়ন। দর্শনার্থীদের জন্য অনলাইন রেজিস্ট্রেশন, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণ, বায়োমেট্রিক অ্যাক্টিভেশন এবং কিউআর কোড সংবলিত অস্থায়ী পাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে একজন লোক কতবার সচিবালয়ে আসলেন, কবে আসলেন– এসব নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ঘন ঘন সচিবালয়ে প্রবেশে নোটিশ ইস্যু হবে এবং এসব ডেটা অ্যানালাইসিস করে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

এছাড়া ‘টাইম-বেসড এন্ট্রি অ্যান্ড এক্সিট’ সুবিধার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের চলাচল আরও সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা চাইলে একজন দর্শনার্থীকে মাত্র এক ঘণ্টার জন্যও সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারবেন। সময় শেষ হওয়ার আগেই ওই দর্শনার্থীর মোবাইলে পাঠানো হবে সক্রিয় বার্তা।

Manual2 Ad Code

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, পূর্বে সচিবালয়ের নিরাপত্তার নামে কোটি কোটি টাকা বেহাত হয়েছে। নিম্নমানের স্ক্যানার, সস্তা সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে প্রশাসনের এই কেন্দ্রবিন্দুতে নামমাত্র নিরাপত্তাবলয় তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বমানের এই উদ্যোগের ফলে সবকিছু থাকবে নিয়ন্ত্রিত এবং কার্যকর। পূর্বে যেমন সিসিটিভি আছে কিন্তু ফুটেজ নেই; স্ক্যানার আছে কিন্তু স্ক্যান হয় না– এমন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসছে। নতুন এই নিয়মে সচিবালয়ে যেসব যানবাহন প্রবেশ করবে সেসব যানবাহনে অস্ত্র থাকলে এই স্ক্যানার সঙ্গে সঙ্গে সেটা শনাক্ত করবে। পাশাপাশি যদি কোনো গাড়িতে মাদক পরিবহন করা হয় সেটাও শনাক্ত করে সিগন্যাল দেবে। এই স্ক্যানার ৫০০ মিলির উপরে যে কোনো মাদক শনাক্তে কার্যকর হবে। তবে এই শনাক্তের মাত্রা যাতে ১০ গ্রামে নিয়ে আসা যায় সে বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় গাড়ির মধ্যে তিনজন বসে আছেন কিন্তু পাস আছে একজনের; এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে গাড়িতে কতজন আছে সেগুলো শনাক্ত করা হবে। ফলে অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। এ ছাড়া প্লাস্টিকের বোতল বা পণ্য নিয়েও প্রবেশে কঠোরতা আসবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মুহাম্মদ শামসুদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ সচিবালয় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু। তাই এখানে নিরাপত্তাব্যবস্থাও হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। শুধু সিসিটিভি বসালেই হবে না, সেগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলে সন্দেহজনক ব্যক্তি, অননুমোদিত প্রবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ অপারেটর ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাজী শরীফ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমান সময়ে নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রযুক্তির বিকল্প নেই। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা, ডিজিটাল পাস এবং আরএফআইডি প্রযুক্তি যুক্ত হওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ। এর ফলে কে কখন প্রবেশ করছে, কত সময় অবস্থান করছে কিংবা কোনো ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে ঘন ঘন প্রবেশ করছে কি না– এসব সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।

Manual5 Ad Code

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় এখন প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সেই ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী। বিশেষ করে এআইভিত্তিক ক্যামেরা ও ডেটা অ্যানালাইসিস ব্যবস্থার মাধ্যমে সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করা গেলে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি আগেভাগেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন) মো. জসিম উদ্দীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমান সরকার সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কার্যক্রম সচিবালয়কেন্দ্রিক হওয়ায় এখানে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের অকার্যকর ও পুরোনো যন্ত্রপাতির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হচ্ছে, যাতে সচিবালয়ের প্রতিটি প্রবেশপথ, যানবাহন ও অভ্যন্তরীণ চলাচল সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনা যায়। নতুন এ ব্যবস্থার মাধ্যমে শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে না, বরং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এ কেন্দ্রকে আরও সুরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।সুএঃ ঢাকা পোস্ট