আজ বৃহস্পতিবার, ৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাজেটে বাড়ছে ঋণের বোঝা

editor
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২৬, ০১:৫০ পূর্বাহ্ণ
বাজেটে বাড়ছে ঋণের বোঝা

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে। প্রতি বছরের মতো এবারও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—নিত্যপণ্যের দাম কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হবে। কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কারণ আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বড় একটি অংশ চলে যাবে অতীতে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে। একই সঙ্গে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কৃষি ও খাদ্য খাতে বিপুল ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

ফলে বাজেট নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই—সরকার কি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কোনও বার্তা দিতে পারবে— নাকি ঋণের সুদ, ভর্তুকি ও পুরোনো দায় পরিশোধ করতেই বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাবে?

সুদ পরিশোধেই রেকর্ড ব্যয়

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার হতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ও বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সরকারের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৪ টাকাই চলে যাবে শুধু সুদ পরিশোধে। এই অর্থ দিয়ে নতুন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে না, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না কিংবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরাসরি কোনও সেবা বাড়বে না। এটি মূলত অতীতে নেওয়া ঋণের দায় বহনের খরচ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এতটা উদ্বেগজনক ছিল না। ২০২০-২১ অর্থবছরে সুদ পরিশোধের ব্যয় ছিল প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে সেই ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটি সরকারের ঋণনির্ভর অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।

কেন বাড়ছে ঋণের বোঝা?

গত এক দশকে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন, ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায় সরকারকে ব্যাপক ঋণ নিতে হয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের আয় যতটা বেড়েছে, ব্যয় তার চেয়ে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে বারবার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন সেই ঋণের সুদই নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ নেওয়া নিজেই সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয়েছে এবং কতটা অর্থ প্রত্যাশিত সুফল দিতে পেরেছে। যদি ঋণের অর্থ থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় সৃষ্টি না হয়, তাহলে সেই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই এসে পড়ে।

Manual3 Ad Code

বাড়ছে ভর্তুকির চাপ

ঋণের সুদের পাশাপাশি সরকারের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ভর্তুকি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্যপণ্যের বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে আগামী অর্থবছরে ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

Manual8 Ad Code

বিদ্যুৎ বিভাগ একাই প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস আমদানির জন্য পেট্রোবাংলারও বিপুল অর্থ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার ও খাদ্য খাতেও বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি ভর্তুকি কমিয়ে দেয়, তাহলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার পুরো ভর্তুকি দিলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে। ফলে সরকার এক ধরনের নীতিগত দ্বিধার মধ্যে রয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয় কমছে, বাড়ছে পরিচালন ব্যয়

বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে কোনও জাতীয় বাজেটই শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। গড় বাস্তবায়ন হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজেট বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা দিলে প্রথমে কাটছাঁট করা হয় উন্নয়ন ব্যয়েই।

গত অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন সন্তোষজনক নয়। অন্যদিকে বেতন-ভাতা, পেনশন, সুদ পরিশোধ এবং ভর্তুকির মতো পরিচালন ব্যয় প্রায় পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ খাতগুলো চাপের মুখে পড়ছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও তীব্র

Manual7 Ad Code

সরকারি তথ্য বলছে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে সেই স্বস্তির প্রতিফলন এখনও স্পষ্ট নয়। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং পরিবহন ব্যয়ের উচ্চ চাপ এখনও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। অনেক পরিবারকে ব্যয় কমাতে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম আবার বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারের প্রতিটি পণ্যের দামে গিয়ে পড়ে।

রাজস্ব আহরণের বড় চ্যালেঞ্জ

সরকার এবার বড় ধরনের নতুন কর আরোপের পথে না গেলেও রাজস্ব সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়লে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা থাকবে—ব্যয় কমানো অথবা আরও ঋণ নেওয়া। উভয় ক্ষেত্রই অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা

অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ সাধারণ মানুষের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দাম কত। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল বাড়বে কি না। চাকরির সুযোগ তৈরি হবে কি না। সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় সামলানো যাবে কিনা। তাই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কেবল আকার বা বরাদ্দ দিয়ে নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তার ওপর।

Manual7 Ad Code

সামনে কঠিন পরীক্ষা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি কঠিন পরীক্ষা। একদিকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণের সুদ পরিশোধ, অন্যদিকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ভর্তুকির চাপ। এর সঙ্গে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু ব্যয় সংকোচন বা নতুন কর আরোপ করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে অপচয় কমানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।

অন্যথায় ঋণের সুদ, ভর্তুকি, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। আর সেই কারণেই এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি হবে দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিবিউন