কঠিন বাস্তবতার মুখে’ দক্ষিণ এশিয়ার জেন জি অভ্যুত্থান
কঠিন বাস্তবতার মুখে’ দক্ষিণ এশিয়ার জেন জি অভ্যুত্থান
editor
প্রকাশিত জুন ১৩, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
Manual1 Ad Code
অনলাইন নিউজ ডেস্ক
সরকারবিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটা দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ— বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ এক বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে।
দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত জনসমর্থন ধরে রেখেছে তরুণদের নেতৃত্বে গড় ওঠা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা তিন সরকার।
তবে এসব সরকারের সামনে এখন ঘরে-বাইরের নানা প্রতিকূলতা হাজির হয়েছে বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক এ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মনে করে, চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং ভারতের সঙ্গে জটিল সম্পর্কের কারণে এসব প্রতিকূলতা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।
চ্যাথাম হাউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন বিশ্লেষক শিতিজ বাজপেয়ী।
মিল-অমিল
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতম হন শেখ হাসিনা। তার আগে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা গণবিক্ষোভে পতন ঘটন গোটাবায়া রাজাপাকসে সরকারের। এ দুটি ঘটনার পর গেল বছর জেন-জি বিক্ষোভে নেপালে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়।
শিতিজ বাজপেয়ী লিখেছেন, অর্থনৈতিক সংকট, আর্থ-সামাজিক চাপ ও অকার্যকর রাজনীতি— এই তিন কারণ জনগণের ক্ষোভ উসকে দেয়, যদিও দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আর্থিক সহায়তায় অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছিল।
তিন দেশেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্রমবর্ধমান স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অভিযোগ ওঠে।
সরকারবিরোধী বয়ান তৈরি করার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে নিঃসন্দেহে দেশভেদে কিছু ভিন্নতা ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পণ্য সরবরাহে ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের সংকট শ্রীলঙ্কায় বিক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত ‘আরাগায়েলা’ নামে পরিচিত প্রবল বিক্ষোভে গোটাবায়া রাজাপাকসের সরকারের পতন ঘটে। পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।
ফাইল ছবি
Manual3 Ad Code
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিক্ষোভের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য বেশি কোটা সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে। আর নেপালের কে পি শর্মা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আন্দোলনের পর নির্বাচনের গতিপথও একেক দেশে একেক রকম ছিল।
চলতি বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নেপালের ভোটাররা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহকে। ‘বালেন’ নামে পরিচিত এ গায়ক নির্বাচন করেছেন চার বছরের পুরোনো দল আরএসপি থেকে।
তার আগে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তারেক রহমানকে, যিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সাধারণ নির্বাচনে জনগণ প্রতিষ্ঠিত বামঘেঁষা রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রত্যাখান করে ভরসা রাখেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদী দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনা-জেভিপির নেতৃত্বাধীন জোটের অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের উপরে।
‘বিপ্লবের’ পরের অবস্থা
এ অঞ্চল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিতিজ বাজপেয়ী লিখেছেন, পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল এখন ভেতর-বাইরের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
নতুন শুরুর আশায় এখনও অবিচল রয়েছে। বড় ধরনের জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসায় নতুন সরকারগুলোকে ঘিরে সুযোগের একটি আবহ তৈরি হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশেও, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কারগুলো গণতান্ত্রিক পুনর্নবায়নের প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করেছে।
তবে শুরুতে যে উচ্ছ্বাস ছিল, তা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ‘অক্ষমতা বা অনাগ্রহের’ কারণে নতুন সরকারগুলো নিজেদের প্রতি তৈরি হওয়া জনআস্থা নষ্ট করছে— এমন ধারণা ক্রমেই বাড়ছে।
নতুন সরকারগুলোর অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন ভুল পদক্ষেপও এসব সংশয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নেপালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন বালেন্দ্র শাহ। কিন্তু সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই সেই কেলেঙ্কারির অভিযোগে তার মন্ত্রিসভার দুই সদস্যকে পদ ছাড়তে হয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতি নিয়ে গণঅসন্তোষের মধ্যে গত বছর ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপকে অনেকেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন, যা ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এর আগে বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভোট কমে যায়।
বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সেনাসদস্যদের ধীরে ধীরে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সহিংস অপরাধ ক্রমেই নাগরিকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এছাড়া এমন উদ্বেগও আছে যে, বিএনপি সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তারা বড় ধরনের পরিবর্তন এড়িয়ে যেতে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কারের কেবল কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পারে।
এ বছরের শেষ দিকে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, তা হবে সংস্কার বাস্তবায়ন বিষয়ে বিএপির নতুন সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা।
নিবন্ধনহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, বিস্তৃত পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি ও চাকরির সঙ্কট নিয়ে শুরু হওয়া জেন-জিদের বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত হিমালয়ের দেশটিতে মারাত্মক প্রাণঘাতী সংঘাত উসকে দিয়েছিল। ফাইল ছবি। ছবি: রয়টার্স
Manual4 Ad Code
স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নেই
শিতিজ বাজপেয়ী লিখেছেন, বড় ধরনের জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসলেও এসব দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে বৃহত্তর সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা না গেলে এই নিশ্চয়তা হুমকিতে পড়ে যাবে।
Manual4 Ad Code
এই তিন দেশেই দীর্ঘ সময় ধরে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা চলার নজির রয়েছে।
নেপালে এক দশকের মাওবাদী বিদ্রোহে জর্জরিত, যেখানে জাতিগত বিভাজন, আঞ্চলিক বিভেদ ও আদর্শগত মতপার্থক্যসহ নানা ধরনের সামাজিক বিভাজন রয়েছে। ২০১৫ সালে পাস হওয়া সংবিধানে এসব বিভাজন দূর করার চেষ্টা হয়েছিল।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, নতুন সরকার শহুরে তরুণ ভোটারদের মনজয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দিলে অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে। আর সেরকমটা ঘটলে সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় সরকার জাতিগত রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধের পরও সিংহলি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। এটি দেশটির সংখ্যালঘু হিন্দু ও মুসলমান তামিল জনগোষ্ঠীর পুনর্মিলনের পথে এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিয়ে শিতিজ লিখেছেন, বাংলাদেশে মূল বিভাজনটা মূলত বড় দুই দল— বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। দেশটিতে নির্বাচনে মধ্য দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য ‘তৃতীয় শক্তি’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
শিতিজ মনে করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকার কথা, সেটা আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞায় দেখা যাচ্ছে না।
Manual7 Ad Code
তার মতে, প্রতিহিংসার রাজনীতির যে চক্র ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা ভাঙতে হলে কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের প্রয়োজন পড়বে।
শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স
ইরান যুদ্ধ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক
এই তিন দেশের যেসব চাপে রয়েছে, তা চলমান ইরান যুদ্ধ আরো বাড়িয়ে তুলেছে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
তার মতে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি রেশনিং এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে তিনটি দেশই বড় ধরনের খেসারত দিচ্ছে।
এসব দেশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা প্রবাসী আয়ের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে নির্বাচনের পর যে সময়টা স্বস্তি থাকে, তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে গেছে।
ভারতের সঙ্গে এসব দেশের বর্তমান সম্পর্কও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন দেশের সরকারই নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। কারণ, ভারত এই তিন দেশের জন্যই মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
শিতিজ বাজপেয়ী মনে করেন, ইরান যুদ্ধের ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সংকটে পড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে নয়াদিল্লি জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়েছে, যা সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবশালী অবস্থান প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসও সৃষ্টি করে। বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা তাদের জন্য সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাম্প্রতিক বিজয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একদিক আশীর্বাদ, আরেক দিক থেকে উদ্বেগের কারণও।
বিজেপির এই জয়ের ফলে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সমন্বয় ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে চারটি এখন বিজেপি বা তাদের মিত্রদের হাতে রয়েছে। এসব রাজ্য থেকে ‘পুশইনের’ ঘটনা সম্প্রতি দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
নেপালে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্ব কাঠমাণ্ডু ও দিল্লির সম্পর্কে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার অস্বীকৃতি এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত বিরোধ তার উদাহরণ।
বিজেপি সম্প্রতি নেপালের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির (আরএসপি) নেতাদের আতিথ্য দিয়েছে এবং দুই দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ নেপালের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন শিতিজ। সুএ: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর