আজ রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক পালাবদলে উন্নয়ন গতিহারা

editor
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৬, ২০২৪, ০৬:১০ পূর্বাহ্ণ

Manual7 Ad Code

টাইমস নিউজ 

 

Manual8 Ad Code

রাজনৈতিক পালাবদলের ধাক্কা লেগেছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। এর ফলে চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে বৈদেশিক সহায়তা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত অর্থবছর ছেঁটে ফেলা হয়েছিল ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ। তবে এবার বেশি টাকার বরাদ্দই বাদ দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চাওয়া হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান আছে এমন প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাড়িয়ে ডলার সংগ্রহ বৃদ্ধি করা।

এদিকে এরই মধ্যে সংশোধিত এডিপি তৈরির জন্য প্রকল্পভিত্তিক বৈদেশিক অর্থের বরাদ্দ নির্ধারণে চার দিনের সিরিজ বৈঠকে বসছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। আগামী ৯ ডিসেম্বর শুরু হতে যাওয়া এসব বৈঠকে ৫১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন। এতে সভাপতিত্ব করবেন ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইআরডির সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আজম বুধবার বলেন, দেশে একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতি চলছে। যেভাবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে অতীতে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। সেই সঙ্গে প্রশাসনে রদবদল হচ্ছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

সব মিলিয়ে উন্নয়ন সহযোগীরাও একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। ফলে প্রকল্পের কম বাস্তবায়ন এবং অর্থছাড়ও কম হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারও ব্যয় সংকোচনের নীতিতে হাঁটছে। এরই মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় সংশোধিত এডিপিতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ কমার শঙ্কা তো থেকেই যায়।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা অংশে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৩৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বাদ দিয়ে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দাঁড়াতে পারে ৮০ হাজার কোটি টাকা।

এর আগে গত ৩১ অক্টোবর চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ এবং আগামী ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দের প্রক্ষেপণ দিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাছে চিঠি দেয় ইআরডি। সেখানে বলা হয়, বৈদেশিক সহায়তাযুক্ত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির ভিত্তিতে বরাদ্দ নির্ধারণ করে ১০ নভেম্বরের মধ্যে বরাদ্দ চাহিদা জমা দিতে হবে। এরই মধ্যে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ জমা দিয়েছে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এতে মনে করা হচ্ছে, এবার বেশি অঙ্কের বরাদ্দ কমতে পারে। ইআরডির একাধিক কর্মর্কতার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

ইআরডি সূত্র জানায়, সিরিজ বৈঠকের অংশ হিসাবে রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে আগামী ৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক। এছাড়া ১০ ডিসেম্বর ৯টি, ১১ ডিসেম্বর ১৪টি এবং ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক। এসব বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে কোন প্রকল্পে কত বৈদেশিক সহায়তা অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। তবে প্রকৃত বরাদ্দ চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছরের মূল এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা (ঋণ ও অনুদান) খরচের লক্ষ্য ছিল ৯২ হাজার ২০ কোটি টাকা। সেখান থেকে কমিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় ৮৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে কমানো হয়েছিল ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ইআরডি এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে চার মাসে বৈদেশিক অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পগুলোতে বিরাজ করছে ধীরগতি।

Manual7 Ad Code

ইআরডি বলছে, গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থছাড় করেছে ২৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছাড়ের পরিমাণ ছিল ৩৬২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। তুলনামূলক হিসাব করলে দেখা যায়, এ অর্থবছরের চার মাসে ৩৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার কম ছাড় হয়েছে।

Manual5 Ad Code

এদিকে আইএমইডি বলছে, গত চার মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বৈদেশিক সহায়তা অংশের খরচ করতে পেরেছে ৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা বা মোট বরাদ্দের ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে খরচ হয়েছিল ১১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা বা ওই সময়ের বরাদ্দের ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত কয়েক বছরের তুলনায় চার মাসে অনেক কম অর্থ খরচ হয়েছে।

ইআরডি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোনো অর্থবছরই মূল এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা ব্যয়ের লক্ষ্য ঠিক থাকেনি। পরবর্তী সময়ে অর্থবছরের ৬ মাস যেতে না যেতেই বড় অঙ্কের বরাদ্দ ছেঁটে ফেলতে হয়। তবে এক্ষেত্রে গত ২০২২-২৩ অর্থবছর কমেছে ১৭ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।

Manual3 Ad Code

এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে কাটছাঁট করা হয়েছিল ১৫ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ছিল ৯৯ হাজার ২৪ কোটি টাকা। সেখান থেকে বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয় ৭২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ কমানোর রেকর্ড তৈরি হয়। করোনা মহামারির কারণে এ অর্থবছর বাদ দেওয়া হয় ১৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। এ সময় মূল এ ডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৫১৬ কোটি টাকায়।

এছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে মূল এডিপিতে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এডিপি সংশোধনের সময় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কমানো হয়। বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাদ দেওয়া হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কমানো হয় ৮ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

ইআরডি, আইএমইডি এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, অর্থবছর শুরুর আগেই বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকূলে বৈদেশিক সহায়তার বরাদ্দ বাড়িয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে বাস্তবায়ন পর্যায়ে দেখা দেয় নানা জটিলতা। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প তৈরিতেই দুর্বলতা এবং দক্ষতার অভাব।

এছাড়া যেনতেনভাবে প্রকল্প তৈরি, বাস্তবায়ন পর্যায়ে কার্যকর তদারকির অভাব, নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) এবং পিএসসি (প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি) বৈঠক না হওয়া। সেই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, উন্নয়ন সহযোগীদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব। আরও আছে প্রয়োজনীয় অর্থছাড় না হওয়া, প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি ইত্যাদি কারণ।