অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অতিরিক্ত অর্থ ছাপিয়ে এবং স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ফলে অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। আর এই অবস্থান থেকে সরকার সরে আসবে না। তিনি বলেন, এ ধরনের নীতির কারণে একদিকে সুদের হার বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে বেসরকারি খাত চাপে পড়ে এবং কার্যত পিছিয়ে যায়, যা একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
দুর্বল নীতি হলে ঝুঁকিতে পড়বে ডিজিটাল অর্থনীতি
এদিকে পরে গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে আরেক প্রাক-বাজেট বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছে এ তথ্য সত্য নয়। টাকা ছাপিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে চায় না সরকার। আরও বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া কমানো ও টাকা ছাপানো থেকে সরে আসা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার এমন একটি নীতিমালা অনুসরণ করতে চায়, যেখানে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি বাড়ানো হবে না এবং বেসরকারি খাতের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা হবে না। এটি সরকারের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান দিকনির্দেশনা। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির সুফল যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি মনে করেন, পরিবারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নারীরা দক্ষ হওয়ায় তাদের হাতে অর্থ পৌঁছালে তা সাশ্রয় ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসা খরচ বেশি হলে মানুষের জীবনমান কমে যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের বাস্তব আয় বৃদ্ধি পায়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন উদ্যোগভিত্তিক খাতকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাতগুলোই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। পাশাপাশি গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার জন্য সরকার কাজ করছে। তিনি আরও জানান, গ্রামীণ কারিগরদের পণ্য উন্নত নকশা, পরিচিতি ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
ছুটির দিনেও চালু থাকবে বিএসটিআই সেবা
অর্থমন্ত্রী বলেন, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, নাট্যশিল্প, চলচ্চিত্র ও সংগীতকেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ এসব ক্ষেত্রও জাতীয় আয়ে অবদান রাখতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে এবং অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত ফলাফল দিতে পারছে না।
কর আদায় বাড়ানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি না থাকলে কর সংগ্রহ বাড়ানো কঠিন। তবুও সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
Manual8 Ad Code
জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো হচ্ছে, যাতে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারকে চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিতে হবে। এ জন্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে নিয়মকানুনের জটিলতা কমানো জরুরি। ব্যবসার পথে অতিরিক্ত বাধা থাকলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় না।
Manual8 Ad Code
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক এতীভূতকরণ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। এ সময় বন্ধ কারখানা চালু করার বিষয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্যাকেজ ঘোষণা করবে বলেও জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সভায় তিরি জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি যেদিন দায়িত্ব গ্রহণ করে, সেদিন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস এবং ওভারড্রাফট থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা গত ২২ এপ্রিল কমে হয়েছে ১১ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। গভর্নর বলেন, ”আমাদের কান্ট্রি রেটিং কমে গেছে। এতে আমাদের বরোয়িং কস্ট, প্রাইভেট সেক্টরের বরোয়িং কস্ট বেড়ে গেছে। এর মধ্যে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দিয়েছে, যা সঠিক নয়।”
এদিকে সচিবালয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাজেটের আকার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াবে সরকার বলেও জানান এই মন্ত্রী।
এদিকে রেভেনিউ বাড়াতে টেলিভিশন কানেকশনকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন টেলিভিশন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি প্রযুক্তি নির্ভর কৃষিতে বিনিয়োগ, ঋণ খেলাপি ও আয়কর রিটার্নের বাইরে থাকা টিনধারীদের বিরুদ্ধে বাবস্থা নেয়ার দাবিও জানান তারা।
Manual1 Ad Code
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে বাজেটের আকার বৃদ্ধি অপরিহার্য। যদি দেশের প্রবৃদ্ধি চান, বিনিয়োগ চান, তাহলে বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।
‘স্বৈরাচার, তার পরবর্তী ১৮ মাস- আমি বিগত দিনে যেতে চাই না। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আপনি চিন্তা করেছেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় যাচ্ছে, কত বড় গর্তের মধ্যে আমরা পড়েছি? এখান থেকে বেরিয়ে আসার যে সংগ্রাম, এটা আমরা সবাই মিলে করতে হবে। বিএনপি বা সরকার একা এটা করতে পারবে না,’ যোগ করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি জোর দিয়ে জানান, সরকারের অগ্রাধিকার হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা বজায় রাখা। অতীতের বিএনপি সরকারের উদাহরণ টেনে তিনি দাবি করেন, সেই সময়গুলোতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক খাত স্থিতিশীল ছিল।
আমির খসরু বলেন, সরকার অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করতে চায়। রাজনৈতিক গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রও জরুরি। মানুষ যদি অর্থনীতিতে অংশ নিতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না।
শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শুধু প্রথাগত ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে।
ন্যানো টেকনোলজি ও ডিজিটালাইজেশন নিয়েও সরকার গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে বলে জানান তিনি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য জনগণকে দক্ষ করে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী।
অন্যদিকে অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক-বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির সভাপতি দৌলত আকতার মালার নেতৃত্বে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ইআরএফ বলেছে, বর্তমানে দেশ একটি অস্বাভাবিক ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী ও বিশেষধর্মী বাজেট প্রণয়ন জরুরি, যেখানে সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুএঃ যুগান্তর