তেল, কয়লা ও গ্যাসের সংকটসহ সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এবার সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে। ঢাকার বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে ডুবে থাকছে। রাতের স্বস্তির ঘুম কেড়ে নিচ্ছে লোডশেডিং। পরিস্থিতি দিনদিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। যে কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছেন। এদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক অতিরিক্ত ৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি এবং বাণিজ্যিক গ্যাসের বড় সংকট হতে পারে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, বিশ্বকাপে ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ দেখার সুবিধার জন্য সোমবার রাত সাড়ে ১০টার পর ডিজেলভিত্তিক দুইটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে অতিরিক্ত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকার বেশি। পিডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, খরচ বেশি হলেও কিছু করার নেই। রাজনৈতিক নেতাদের চাপ এবং এলাকাভিত্তিক ক্ষোভের মুখে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়েছে।
এ সংক্রান্ত কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, এবার গত বছরের চেয়ে বেশি গরম পড়ছে। গত বছর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এবার ২৮ জুন রাত ৯টায় সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এরপরও বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২১৬ মেগাওয়াট। এবার বিশ্বকাপ খেলার জন্য ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। এই চাহিদা মেটানোর মতো পরিকল্পনাও সরকারের ছিল না। যে কারণে জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
Manual5 Ad Code
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার বিদ্যুৎ খাতও গ্যাস কম পাচ্ছে। যেমন: ২০২৪ সালের ১৫ জুন বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস দেওয়া হয়েছিল ১০১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। ২০২৫ সালের একই দিনে গ্যাস দেওয়া হয়েছিল ৯৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। আর ২০২৬ সালের একই দিনে গ্যাস পেয়েছে ৮৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। একইভাবে ২০২৪ সালের ২৪ জুন বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস দেওয়া হয়েছিল ১০০ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, ২০২৫ সালের একই দিনে ১০৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট এবং ২০২৬ সালের একই দিনে দেওয়া হয়েছে ৮৮ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। ২০২৪ সালের ২৯ জুন বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৯৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট, ২০২৫ সালের একই দিনে ১০২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট এবং ২০২৬ সালের এই দিনে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৮৯ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। তবে সরকারি সিদ্ধান্তের পর ২০২৬ সালের ৩০ জুন গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে গড়ে বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হয়েছিল দৈনিক ১০১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট, ২০২৫ সালের একই সময়ে ১০২ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট এবং ২০২৬ সালে গড়ে ৯১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, স্থানীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোয় প্রতিদিন উৎপাদন কমছে। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো হচ্ছে। ২ বছর আগে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হতো ২৮০ কোটি ঘনফুটের মতো। এখন সেখানে দেওয়া হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। এতদিন দৈনিক ৯২ থেকে ৯৩ কোটি ঘনফুট দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হবে ১০০ কোটি ঘনফুট। সার কারখানার উৎপাদন ঠিক রেখে অন্য খাত থেকে এই বাড়তি গ্যাস দেবে পেট্রোবাংলা।
তেলের বিদ্যুতের ক্ষমতা আছে বিদ্যুৎ নেই : দেশে ৫৩টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। যার বেশির ভাগই বেসরকারি খাতের। এগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট। পিডিবির হিসাব থেকে জানা যায়, বকেয়া বিলের কারণে এ বছর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তেমন একটা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের ২১ জুন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল ১ হাজার ৩৭১ মেগাওয়াট। ২০২৫ সালের একই দিনে ৩ হাজার ২৯৭ মেগাওয়াট এবং ২০২৬ সালের একই দিনে ১ হাজার ৯৯১ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের ২৪ জুন ৪ হাজার ৩৩ মেগাওয়াট, ২০২৫ সালের একই দিনে ৩ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট এবং ২০২৬ সালের একই দিনে ২ হাজার ৪২২ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের ২৯ জুন ৩ হাজার ৮২০ মেগাওয়াট, ২০২৫ সালের একই দিনে ২ হাজার ৬৭৭ মেগাওয়াট এবং ২০২৬ সালের একই দিনে ২ হাজার ৪০৮ মেগাওয়াট। গরমের মাস জুন। এ মাসে ২০২৪ সালে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়েছিল গড়ে ৩ হাজার ১৩৭ মেগাওয়াট, ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট এবং ২০২৬ সালে গড়ে ২ হাজার ৪১৩ মেগাওয়াট। পিডিবি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুনে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে এই কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট এবং ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
Manual4 Ad Code
পিডিবি এবং আইপিপিগুলো জানিয়েছে, দেনার ভারে জর্জরিত পিডিবি। তাদের কাছে এখন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওনা ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ফার্নেস অয়েলভিত্তিক আইপিপিগুলো পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ কারণে আইপিপিগুলো তেল কেনার অর্থ জোগান দিতে পারছে না। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়শনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত যুগান্তরকে বলেন, এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় পুরো বিশ্বব্যাপী বেশি গরম পড়বে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র-আইপিপিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলে লোডশেডিং সহনীয় রাখার একটা উপায় বের হতো।
Manual7 Ad Code
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার বিশ্বকাপ খেলা দেখার জন্য বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদা আছে। বিশেষ করে মধ্যরাতের ম্যাচগুলো রাত জেগে দেখছেন অনেকে। এ কারণে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা বেড়েছে। পিডিবি জানিয়েছে, দেশের ৬২ ভাগের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় বাসাবাড়িতে। শিল্পকারখানা বা দোকানপাট বন্ধ হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমে-এটি এবার তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। যে কারণে রাতে লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। মঙ্গলবার রাত ২টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। একই দিনে রাত ৩টায় ২ হাজার ৫৮৪ মেগাওয়াট এবং ভোর ৪টায় লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ২৬৩ মেগাওয়াট।
এদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোরও একই অবস্থা। এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং নরেনকো এবং মাতারবাড়ীসহ অনেক কেন্দ্র পুরো ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। কয়লার সংকটের কারণে এসএস পাওয়ার এবং নরেনকো পিক আওয়ারে পুরো উৎপাদন করছে। অথচ বেইজড লোড কেন্দ্র হিসাবে এগুলো পুরোদমে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা।
Manual7 Ad Code
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহিরুল ইসলাম মঙ্গলবার (৩০ জুন) বলেন, আশা করি বুধবারের মধ্যে পরিস্থিতি ভালো হবে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে রামপালের দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি বাড়ানো গেছে বলে জানান তিনি।তথ্য সুএঃ যুগান্তর