ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত জোটের শরিক এনসিপিসহ কয়েকটি দলও অভিযোগ করছে। গত ২৫ বছরে বিএনপি ও জামায়াত জোট করে তিনটি নির্বাচন করলেও এবার আওয়ামী লীগশূন্য মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ভোটে অবৈধ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে বিদ্ধ করছে।
গতকাল রোববার (১৮ জানুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে অভিযোগ করেছেন, ইসির কিছু কর্মকর্তা একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ প্রশাসন ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তা একটি দলের প্রতি ন্যক্কারজনকভাবে কাজ করছেন।
একই দিন সন্ধ্যায় যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতে জামায়াত অভিযোগ করেছে, ইসি পক্ষপাত করছে। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে ইসি পক্ষপাত করছে। প্রশাসন একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।
Manual1 Ad Code
ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে আগের দিন শনিবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে, তবে আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশন সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত ভূমিকা, কিছু বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছে। তার পরও একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই।’
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত পাল্টা অভিযোগ করেছে, তারেক রহমানের নিরাপত্তার নামে সরকার বাড়াবাড়ি করছে। দলটি দাবি জানিয়েছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য জামায়াত আমিরকে তারেক রহমানের সমান নিরাপত্তা ও সুবিধা দিতে হবে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক এনসিপিও ইসি ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে দলটির মুখপাত্র পদে আসা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গতকাল নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানিতে অংশ নেন। তিনি বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে অভিযোগ বলেছেন, একটি দলের মহাসচিবের সঙ্গে ইসি বৈঠকের পর ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বৈধ করেছে। ইসি এভাবে পক্ষপাত করলে এনসিপি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, তা ভাবতে হবে।
এনসিপির অভিযোগ, ঢাকা-১১ আসনে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম বিদেশি নাগরিক। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন তাঁর প্রার্থিতা বহাল রেখেছেন।
প্রশাসন নিয়ে অভিযোগ বিএনপির
নির্বাচন কমিশনের কিছু কর্মকর্তা একটি দলের হয়ে কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সিইসিকে বলেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কিছু সিনিয়র কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ পেয়েছি, তারা একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করছেন। আমরা সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছি।’
মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, ইসি অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বলে বিএনপি মনে করে। এসব বিষয়েও সিইসিকে জানানো হয়েছে। বিএনপি চায়, ইসি যেন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে।
Manual5 Ad Code
মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তা একটি দলের পক্ষে কিছু ন্যক্কারজনক কাজ করছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি। সে বিষয়গুলো সিইসিকে জানিয়েছি। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে তদন্তপূর্বক তাদের প্রত্যাহার করতে অনুরোধ জানিয়েছি।’
যাদের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছেন, তারা কোন দলের পক্ষে কাজ করছেন, তা খোলাসা করেননি বিএনপির মহাসচিব। তাঁর অভিযোগের বিষয়ে ইসির কোনো প্রতিক্রিয়াও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
উপদেষ্টা ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জামায়াতের
সন্ধ্যা ৭টার দিকে যমুনায় যান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সরকারপ্রধানের সঙ্গে ঘণ্টাখানেকের বৈঠকের পর তিনি বেরিয়ে যান। দলটির নেতারা জানান, বৈঠকে উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের ‘পক্ষপাতের’ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন।
বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে আবদুল্লাহ তাহের অভিযোগ করেছেন ইসি, প্রশাসন, পুলিশ ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে গভীর সংশয় ও হতাশা তৈরি হবে। নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতি লঙ্ঘিত হলে এর দায় এড়াতে পারবে না ইসি।
Manual4 Ad Code
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াতের নায়েবে আমির বলেছেন, সারাদেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতিত্ব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা এসপি ও ডিসিদের আচরণে নিরপেক্ষতার ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকর্তার তালিকা করা হচ্ছে।
আবদুল্লাহ তাহের বলেছেন, জামায়াত বিশ্বাস করে, প্রধান উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চান। তবে তাঁর আশপাশের কিছু উপদেষ্টা তাঁকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে ড. ইউনূসকে অনুরোধ করা হয়েছে।
জামায়াত ভোটার আনছে, অভিযোগ বিএনপির
সিইসির সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব জামায়াতের বিরুদ্ধে নির্বাচন জালিয়াতির প্রচেষ্টার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডির কপি, বিকাশ নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করছেন, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ, ফৌজদারি অপরাধ। এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেছি। এই আহ্বান ইসিকে জানিয়েছি।’
জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপির মহাসচিব অভিযোগ করেন, ঢাকার কিছু আসনে একটি দল তাদের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে অনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে দেশের ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে ভোটার স্থানান্তর করছে। তিনি বলেছেন, কত সংখ্যক ভোটার, কোন কোন এলাকা থেকে ঢাকা মহানগরের কোন কোন আসনে কী কারণে স্থানান্তর হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ করার জন্য ইসিকে অনুরোধ করা হয়েছে।
পোস্টাল ব্যালট নিয়েও সিইসিকে অভিযোগ জানিয়ে এসেছে বিএনপি। মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি মনে করে, এই ব্যালট পেপার সঠিক নয়। এখানে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে এবং কোনো একটি দলকে বিশেষভাবে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পোস্টাল ব্যালট পরিবর্তনের অনুরোধ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতীক বরাদ্দের পর ব্যালট দিতে ইসিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে বিশ্বাসী দাবি করে দলটির মহাসচিব বলেন, আচরণবিধি রক্ষায় দলের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত সফরও বাতিল করেছেন। অথচ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রধানসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি ভঙ্গ করে প্রচার চালাচ্ছেন।
নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়েছে কিনা– এ প্রশ্নে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে বলেন, ‘আমরা মনে করেছি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের চেষ্টা ইসির আছে। ছোটখাটো কিছু ত্রুটি আছে, সেগুলো তারা ঠিক করে দিতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
তারেকের সমান প্রটোকল, সিসি ক্যামেরা চায় জামায়াত
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত অভিযোগ করেছে, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে ইসি পক্ষপাত করেছে। দলটির নায়েবে আমির বলেছেন, একই বিষয়ে ভিন্ন দলের প্রার্থীর সঙ্গে ইসির ভিন্ন আচরণ দেখছি। একটি দল থেকে ইসিকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তবে চাপে নতি স্বীকার না করে সব দলের জন্য একই নিয়ম হতে হবে।
ডা. তাহের বলেছেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ কাউকেই ভোটকক্ষের ভেতরে প্রবেশ অনুমতি না দিতে জামায়াত সুপারিশ করেছে। এতে প্রধান উপদেষ্টা সম্মতি দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা তাদের বলেছেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদের পর্যায়ে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমানের নিরাপত্তার প্রতি ইঙ্গিত করে ডা. তাহের বলেন, একটি দলের প্রধানের নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ে সরকার বাড়াবাড়ি করছে। কারও নিরাপত্তা বা প্রটোকল নিয়ে জামায়াতের আপত্তি নেই। তবে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একে পক্ষপাতমূলক আচরণ হিসেবে ধরা হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে।
Manual7 Ad Code
ছাত্রদলের কর্মসূচি নিয়ে আপত্তি
পোস্টাল ব্যালট পরিবর্তন ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবিতে গতকাল নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে ছাত্রদল।
সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, প্রধান ইস্যু ব্যালট পেপার। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রভাবে ধানের শীষ প্রতীক ব্যালটের নিচে রাখা হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মতো ছাত্রদলকে হেয় করতে ইসি ভূমিকা পালন করছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোট স্থগিত করেছিলেন সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে ছাত্রশিবিরের আন্দোলনে ইসি নির্দেশ দেয় নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবে।
গতকাল যমুনায় বৈঠকের পর ছাত্রদলের ঘেরাও কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আবদুল্লাহ তাহের। তিনি বলেন, প্রার্থিতার আপিলের সময়ে একটি দলের পক্ষ থেকে ঘেরাওয়ের নামে চাপ তৈরি করা হয় ইসির ওপর। তাদের দলীয় প্রার্থীদের যারা ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক, তাদের যাতে বৈধতা দেওয়া হয়।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন পেছানোর দাবিরও বিরোধিতা করেন জামায়াত নায়েবে আমির। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচন কমিশন অন্যায় ও ক্ষমতাবহির্ভূতভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিল।