আজ শনিবার, ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাজারে ১, ২ লিটারের বোতল উধাওয়ের পরে বাড়ল সয়াবিনের দাম

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
বাজারে ১, ২ লিটারের বোতল উধাওয়ের পরে বাড়ল সয়াবিনের দাম

Manual6 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

  • বোতলজাত ও খোলা উভয় ধরনের সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি চার টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

মাস কয়েক আগ থেকে খুচরায় বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমতে থাকে। রোজার ঈদ শেষে মাস না পেরুতেই রাজধানী ঢাকাসহ অনেক বাজারের দোকানগুলো পরিচিত সব ব্র্যান্ডের তেল শূন্য হয়ে পড়ে। দোকানিরা তখন বলছিলেন, দাম বাড়াতেই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, শান্তিনগর ও সেগুন বাগিচা কাঁচাবাজার ঘুরে গত মঙ্গল ও বুধবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।

ভোজ্যতেলের এ সংকট বাড়তে থাকার মধ্যে সেই পুরনো কৌশলে হেঁটে এবারও লিটারপ্রতি চার টাকা করে সয়াবিনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে সরকারের তরফে। বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ, সরবরাহ সংকট তৈরি করে এবারও বাড়ানো হয়েছে দাম।

খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি ডিলারদের বাকিতে পণ্য দেওয়াও বন্ধ করে দেয় পরিবশেকরা। এতে সক্ষমতা কমে গেলে বাজারে প্রয়োজনীয় মজুদ কমে যায়। দাম বাড়ানোর পর আগের মত বাকিতে ও চাহিদামত তেল দেওয়া শুরু করে প্রতিষ্ঠানগুলো।

Manual2 Ad Code

তারা বলছেন, এবার গত জানুয়ারি থেকে বাকিতে দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ডিলারদের ‘বাড়তি সুবিধা’ (ইনসেনটিভ) দেওয়াও বন্ধ করে দেয় কোম্পানিগুলো। সরকারের রোষানল এড়াতে বাজারে ৫ লিটারের বোতল সরবরাহ বাড়িয়ে সংকটে ফেলে ১ ও ২ লিটারের বোতলজাত তেলের। পাশাপাশি তেল উৎপাদনকারী গ্রুপের অন্যান্য পণ্য কিনতে বাধ্য করে ডিলারদের। এবারও সেই কৌশল বজায় রেখেছে তারা।

অন্যদিকে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ২০০ টাকায় উঠে গেলে কয়েকটি কোম্পানি ১ ও ২ লিটারের বোতল কমিয়ে খোলা তেল বাজারে ছাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন রেস্তোঁরা ও পরিমাণে বেশি লাগে এমন ভোক্তারা ড্রামের খোলা তেলে আগ্রহী হয়ে উঠে।

ব্যবসায়ীদের এমন কৌশলের মুখে পড়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বৈঠক শেষে লিটারে চার টাকা দাম বাড়ানোর খবর আসে।

এদিন বোতলে ভরা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়; দাম বাড়ে ২ শতাংশ হারে।

Manual1 Ad Code

নতুন দর অনুযায়ী, সয়াবিন তেলের ৫ লিটারের বোতলে দাম হবে ৯৭৫ টাকা। একই সঙ্গে খোলা সয়াবিন তেল লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করে সরকার।

ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গত ৯ এপ্রিল থেকে দিয়ে রেখেছিল মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।

এরপর থেকেই বাজারে গুঞ্জন চলতে থাকে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ছে।

অভিযোগ দেবে কে?

কোম্পানির কাছ থেকে কমিশনভিত্তিক পণ্য বিক্রি করে থাকে ডিলাররা। পণ্য কেনার সময়ে কমিশন বুঝে পান ডিলাররা।

কারওয়ান বাজারের একাধিক ডিলার বলেন, কোম্পানির কাছে তেলের টাকা পাঠানোর পর যে চাহিদা দেওয়া হয়, সেখান থেকে কখনো একভাগ-কখনো অর্ধেক টাকার অন্য পণ্য পাঠিয়ে দেন প্যাকেজ আকারে। বাকি টাকার সয়াবিন তেল পাঠান।

বাজারে বেশ পরিচিত এমন একটি ব্র্যান্ডের একজন ডিলার নাম প্রকাশ না করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘প্রত্যেকটা কোম্পানির আটা, ময়দা, মসলা, সরিষার তেল, রাইস ব্রান তেল আছে। নুডলস, মশার কয়েল, নুডুলসের মসলা আছে। এখন এসব না নিলে তেল দিবে না। জোর করে হলেও দেবে।’

অভিযোগ দিচ্ছেন না কেন এমন প্রশ্নে- তাদের ভাষ্য, এখনই তেল দিতে চায় না। অভিযোগ দিলে তো পুরো ব্যবসাই বন্ধ হয়ে যাবে। কোম্পানি কোনো পণ্য দেবে না।

“ব্যবসা করতে এসেছি, ঝামেলা না। এটা দেখার কেউ নাই।”

প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কোনো পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অন্য পণ্য কিনতে ভোক্তাকে বাধ্য করা যাবে না। উৎপাদক থেকে শুরু করে বিক্রেতা পর্যন্ত এই আইনের আওতায় শাস্তি পেতে পারেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য আবু ইউসুফ মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ভোক্তা ও বিক্রেতাকে কোনো পণ্য কিনতে বাধ্য করতে পারবে না কোনো উৎপাদন বা পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান। কোনো প্যাকেজ নিতে বাধ্য করতে বা শর্ত দিতে পারে না আইন অনুযায়ী। এমন অভিযোগ পেলে কমিশন যাচাই-বাছাই করে তদন্ত কমিটি গঠন করে শাস্তি দিতে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘‘একজন ভোক্তাও অভিযোগ দিতে পারেন। সেটি যাচাই করা হবে।’’

Manual7 Ad Code

কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে বাজার তদারকির অংশ হিসেবে তদন্ত করতে পারে কি না, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘কমিশন চাইলে এটাও পারে। কিছু দিন পূর্বে ডিমের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে কমিশন তা করেছিল। তখন কিন্তু ডিমের দাম ফের নাগালের মধ্যে চলে আসে।’’

Manual7 Ad Code

বারবার অভিযান চালানো কঠিন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘ব্যবসায়ীদেরও ভালো মানসিকতার হতে হবে। অভিযান চললে তারা ঠিক হয়ে যান, কিছু দিন পর আবার পণ্য নিয়ে সিন্ডিকেট করেন।’’

সুবিধা বন্ধ ডিলারদের

ডিলাররা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সয়াবিন তেল বিক্রি করলে এতদিন কোম্পানির পক্ষ থেকে বাড়তি কমিশন বা ইনসেনটিভ দেওয়া হত। এতে লিটারপ্রতি বতর্মান কমিশনের চেয়ে এক টাকার মত বেশি মুনাফা করার সুযোগ হত বলে তথ্য দেন কারওয়ান বাজারের পুষ্টির ডিলার সিদ্দিক ইসলাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘এখন তো সেই ইনসেনটিভ নাই। বন্ধ করে দিছে। মালই পাইনা, আবার ইনসেনটিভ। ১০-১২ দিন আগেও মাল কম পাইতাম। এখন একদিন বাদে একদিন পাই। তাতে তেল নিয়ে সমস্যা নাই, বাজারে তেল আছে।’’

সিটি গ্রুপের কারওয়ান বাজারের ডিলার কেন্দ্রের বিক্রয় কর্মী মাজহারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘গত ১০-১২ দিন ধরে সাপ্লাই একটু বেড়েছে। একদিন না আসলে পরের দিন ট্রাক আসে।’’

ডিলার পয়েন্টের গুদামে কী পরিমাণ বোতল আছে তার একটি চিত্র দেখতে চাইলে তিনি বলেন, “কোনো বোতল নাই। যা আসছে সব নিয়া গেছে খুচরা ব্যবসায়ীরা। আবার আসলে দেখতে পাবেন।”

কারওয়ান বাজারে ফ্রেশ ব্রান্ডের ডিলার বিপ্লব চন্দ্র পাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আগে মাল বেশি নিলে কার্টুন প্রতি বাড়তি ইনসেনটিভ দিতো। এখন দেয় না। আমাদের মুনাফা কমে গেছে। কোম্পানি রেট অনুযায়ী আমরা বিক্রি করি। তেলের কোনো সমস্যা নেই।’’

রাজধানীসহ দেশজুড়ে তেলের সংকট যখনই হয়েছে, সরকারের তদারকি বাড়লে কারওয়ান বাজার, মহাখালী, মৌলভীবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখে কোম্পানিগুলো।

কিন্তু পাড়া মহল্লায় সেই সংকট থেকে যায় জানিয়ে যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারের দোকানি মাসুম মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘১, ২ লিটারের বোতল কম। যা পাই নিয়মিত কাস্টমারের জন্য লুকায়া রাখি। তাও মসলা নিতে হয়, পানি নিতে হয়, কারো কাছ থেকে নুডুলস নিতে হয়।’’

তার ভাষ্য, ভোক্তারা কারো তেল পছন্দ করলেও একই গ্রুপের নুডুলস পছন্দ করে না। আবার যে কোম্পানির নুডুলস পছন্দ করে একই কোম্পানির নুডুলসের মসলা নেয় না। এতেই বিপত্তি বেঁধে যায় দোকানিদের।

সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের দোকানি আনোয়ার হোসেন বলেন, “১ ও ২ লিটারের তেলের বোতল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। দেশি-বিদেশি ৫ লিটারের বোতল বিক্রি করি।”

একই কথা বলেন কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা আজমীর ট্রেডার্সের বিক্রেতা জাহিদুল ইসলাম। বলেন, “সরিষা, সয়াবিন, রাইস ব্র্যানসহ যত দেশি-বিদেশি তেল আছে সব বিক্রি করি। কিন্তু ১ ও ২ লিটারে বেচি না।”

তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর