আজ শুক্রবার, ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমি এখন কার জন্য বাঁচব?’, মা ও তিন বোনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সিফাতের আহাজারি

editor
প্রকাশিত জুন ২৬, ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ
আমি এখন কার জন্য বাঁচব?’, মা ও তিন বোনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সিফাতের আহাজারি

Manual3 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

এক নিমিষেই চিরতরে বদলে গেল আঠারো বছর বয়সী তরুণ জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের চেনা পৃথিবী। আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই সকালে জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাড়ি ফিরে তাকে মুখোমুখি হতে হলো এক অবর্ণনীয় বাস্তবতার। নিজের চিরচেনা ঘরে ফিরে তাকে দেখতে হলো জন্মদাত্রী মা আর আদরের তিন বোনের রক্তাক্ত, নিথর দেহ। যে ঘরটি প্রতিদিন মুখরিত থাকত মায়ের স্নেহময় ডাক, বোনদের খুনসুটি আর সুন্দর ভবিষ্যতের সম্মিলিত স্বপ্নে, আজ সেখানে কেবলই বিষাদের স্তব্ধতা আর বাতাসের বুকে ভেসে বেড়ানো কান্নার হাহাকার।

এই হতভাগ্য পরিবারের বিপর্যয়ের শুরু অবশ্য আরও আগে। ২০১৯ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে আকস্মিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। ফেরি করে হাঁড়ি-পাতিল ও সিলভারের সামগ্রী বিক্রি করে তিনি কোনোমতে সংসারের চাকা সচল রাখতেন। ভরসা হারানো সেই কঠিন সময়ে পুরো পরিবারটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি মা শাহিনুর বেগম। একমাত্র ছেলে আর তিন কন্যাসন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে তিনি প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। চরম অভাব-অনটনের মাঝেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। মায়ের এই লড়াইয়ে শামিল হয়ে বড় দুই সন্তানও ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে সংসারের হাল ধরতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।

Manual6 Ad Code

সব দুঃখ-কষ্ট পেছনে ফেলে পরিবারটি যখন নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছিল, ঠিক তখনই বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে এক পৈশাচিক হামলায় তাদের সব স্বপ্ন রক্তে বিলীন হয়ে যায়। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান সিফাতের মা শাহিনুর বেগম, বড় বোন সায়মা আক্তার, মেজো বোন ইকরা আক্তার এবং ছোট বোন শিফা আক্তার। পরবর্তীতে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে নিহত হয়।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সিফাত এখন আক্ষরিক অর্থেই পুরো পৃথিবীতে একা। বাবা, মা কিংবা তিন বোন—আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো আপনজন আর অবশিষ্ট নেই তার। চোখের সামনে নিমেষেই পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এই ধাক্কায় সম্পূর্ণ নির্বাক ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এই তরুণ।

Manual7 Ad Code

বুকের ভেতর জমে থাকা পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সিফাত শুধু একটি প্রশ্নই বারবার আওড়াচ্ছে, তার মা আর বোনদের আসলে কী অপরাধ ছিল? কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়া হলো? এখন আর কার মুখের দিকে তাকিয়ে, কার জন্য সে বেঁচে থাকবে? আদি বাড়ি কুমিল্লায় হলেও সেখানেও এখন তাদের তেমন কোনো আপনজন নেই বলে জানা গেছে।

Manual5 Ad Code

সিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওমর ফারুক রনি তাদের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে জানান, সিফাতের ভাই-বোনেরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনার প্রতি দারুণ অনুরাগী ছিল। তাদের বাবা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সংসার চালাতেন, যিনি পরবর্তীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। বন্ধুকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে রনি বলেন, এই একটি নির্মম ঘটনায় পরিবারটি এখন পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেল।

রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত তাদের একটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাত-আট মাস আগে মাত্র আট হাজার টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। ঘটনার দিন সকালেও সে যথারীতি বাসা থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও ভালোবাসায় পড়াশোনাসহ পরিবারটি বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন একটি সম্ভাবনাময় পরিবারের সদস্যদের এই মর্মান্তিক ও নৃশংস মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

Manual2 Ad Code

এদিকে দুপুরের দিকে লক্ষ্মীপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক হাসপাতাল এবং ঘটনাস্থল সশরীরে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি ওই বাড়ির মালিক, অন্যান্য ভাড়াটিয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।

থানা পুলিশ ও স্থানীয় অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে শাহীনুর বেগম তার সন্তানদের নিয়ে রায়পুরের দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে আমির হোসেন মাস্টারের ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন। সেখানে থাকাকালীন সকালেই এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের পর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক জানান, নিহতদের ঘর ও ঘাতকের পূর্ব পরিচয় সূত্র ধরে তদন্তে জানা গেছে, ঘাতক অন্তর তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় দেড় বছর ওই একই ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করত। তবে গত সাত-আট মাস আগে সে ওই বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়। যেহেতু আগে থেকেই তাদের মধ্যে একটি জানাশোনা বা পূর্ব পরিচিতি ছিল, সম্ভবত সেই সুবাদেই অন্তর সকালে ওই বাসায় অনায়াসে প্রবেশ করতে পেরেছিল এবং পরবর্তীতে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

পুলিশ সুপার আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় আফরোজা বেগম রানী নামের এক প্রতিবেশী অন্তরকে ওই বাসায় সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে সেখানে আসার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তখন অন্তর নিজেকে পানির পাইপ মেরামতের মিস্ত্রি বলে দাবি করে। তবে রানী তার সেই কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে বাইরে থেকে ঘরের কলাপসিবল গেটটি আটকে দেন এবং দ্রুত প্রতিবেশীদের খবর দেন। প্রতিবেশী রানীর এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপের কারণেই মূলত এই লোমহর্ষক খুনের ঘটনার রহস্য এবং ঘাতকের পরিচয় এত দ্রুত উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। তথ্য সুএঃ ইত্তেফাক