কম খরচে আমিষের চাহিদা মেটানোর অন্যতম উৎস ডিম। তবে, ডিম কেনা নিয়েও বর্তমানে দুশ্চিন্তায় ক্রেতারা। নানা অজুহাতেই বাড়ছে দাম। এক মাস আগেও যে ডিম বিক্রি হতো প্রতি ডজন ১০০ থেকে ১১০ টাকা, সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। এতে বাজার পরিস্থিতি আরও প্রতিকূলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।
ডিমের দাম কেন বাড়ছে তা নিয়ে কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারছে না কেউ। অনেকে আবার অজুহাত দিচ্ছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির। এমনকি, পাইকারি ক্ষেত্রে একদিনে ডিমের দুই দামও দেখা গেছে। আর হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ডিমের দাম।
খুচরা দোকানে আজকে (শুক্রবার) যে ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ১৩০ টাকা, সেটি পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। অর্থাৎ, বাজার থেকে মহল্লায় আসতে আসতে ডিমের দাম বেড়ে যাচ্ছে ১০ থেকে ২০ টাকা। আবার পাইকারি ব্যবসায়ীরা সকালে এক দামে বিক্রি করলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে শুরু করেন।
শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজারের খুচরা ও পাইকারি দোকান এবং মিরপুর ২ নম্বর এলাকার ১০টির বেশি মুদি দোকান ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়।
Manual4 Ad Code
ডিমের দাম বাড়ায় নাখোশ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই
হঠাৎ ডিমের দাম বাড়ায় নাখোশ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষই। ক্রেতারা বলছেন, যখন মাছ-মাংসের দাম চড়া তখন ডিমের দামটা কম থাকা উচিত ছিল। অপরদিকে, বিক্রেতারা বলছেন দাম কমলে তাদের বিক্রি ও লাভ দুটোই বাড়তো।
শুক্রবার (০৮ মে) বাজারে প্রতি ডজন মুরগির লাল ডিম ১৩০ টাকা এবং সাদা ডিম ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি ডজন হাঁসের ডিম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে প্রতি ডজন মুরগির লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা ও সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়।
Manual3 Ad Code
বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে হরেক রকমের ডিম।
মার্চ মাসের শেষের দিকে বাজারে প্রতি ডজন মুরগির লাল এবং সাদা ডিম ১০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। আর মহল্লার দোকানে সেটা বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকা করে। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে এসব ডিমের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত।
কথা হয় বাজার করতে আসা এমদাদুল হকের সঙ্গে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “সব কিছুর তো দাম বেশিই, এখন ডিমের দামও বেড়েছে। মাছ-মাংস এখন আমার মতো সাধারণ মানুষের কেনার তালিকা থেকে কমে এসেছে। এখন ডিম কিনে বাচ্চাদের খাওয়াবো, সেটাও চাপ হয়ে যাচ্ছে। আসলে আমরা যে কি কিনে খেয়ে শান্তি পাবো বুঝতেছি না।”
আরেক ক্রেতা আহসান হাবিব বলেন, “ডিমতো প্রতিদিনই লাগে। এটার দামটা কম থাকা উচিত ছিল। দাম কেন বাড়ছে জিজ্ঞাসা করলেই বলে তেলের দাম বেড়েছে। এই এক কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি।”
সহিদ ডিম ঘরের বিক্রেতা মো. সামিউল ইসলাম বলেন, “একবার দাম বাড়লে আর কমাতে চায় না, যতক্ষণ চাহিদা থাকে। কারণ, তাদের (পাইকার) কাছে তো অর্ডার যেতেই থাকে, তারা বুঝতে পারে যে চাহিদা আছে। তাই আর দাম কমায় না। যখন বাজারে অর্ডার কমে যায় তখন তারা বুঝতে পারে এবং দাম কমিয়ে দেয়। কিন্তু, এভাবে তো আমাদের ব্যবসা চলে না। আমরা খুচরা ব্যবসায়ী, আমরা তো আর লাখ ডিম আনি না। বেশি হলে এক হাজার আনি। তারপর বিভিন্ন খরচ মিলিয়ে আমাদের লাভটা কম হয়। যখন দাম কম থাকে তখন আমাদের লাভটা একটু বেশি হয়, কারণ তখন মানুষ কিনে বেশি, তাই পুষিয়ে যায়।”
কথা বলার সময় সামিউল ডিম বিক্রি করতে থাকেন। এ সময় চারটি ডিম নষ্ট বের হয়। সেটা দেখিয়ে তিনি বলেন, “এভাবে হলে কীভাবে লাভ করে ব্যবসা করবো। রোজার পরের দিকে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় কিনে আমরা বিক্রি করেছি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়। রোজার পর থেকে এই পর্যন্ত প্রতি শতে (একশত) লাল ও সাদা ডিমের দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে।”
নানা অজুহাতে বাড়ছে ডিমের দাম
বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে বাজারে ও মহল্লার দোকানগুলোতে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সংকটকে দাম বেড়ে যাওয়ার এক অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিক্রেতারা।
সোহেল পুডিং হাউজের বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, “দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। তেলের ক্রাইসিস যখন শুরু হয়েছে তখন থেকেই ডিমের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর আগে আমরা ১১০ টাকা করে বিক্রি করতাম।”
Manual6 Ad Code
এ সময় নিজের আজকের ক্রয় রসিদ দেখিয়ে তিনি বলেন, “আজকে আমার কেনা দাম হিসেবে প্রতি ডজন ডিমের দাম পড়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা। এরপর আমার খরচ আছে। তারপর ভাঙা আছে। সব মিলিয়ে আমার ১২৪ টাকা ৮০ পয়সা দাম পরে। আর বিক্রি করি ১৩০ টাকা করে। এর নিচে বিক্রি করলে আমি আর কীভাবে লাভ করবো।”
Manual2 Ad Code
ডিমের আড়তের বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, “ছোট ফার্মগুলোকে চাপে ফেলে বড় ফার্মগুলো ব্যবসা করে নেয়। তারা দাম বাড়িয়ে দেয় আর এটার জন্য ছোট ফার্মগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আর তখনই বাজারে একটা সংকট তৈরি হয়, দাম বেড়ে যায়।”
ডিম বিক্রি করছেন এক বিক্রেতা।
এ সময় আরেক বিক্রেতা বলেন, “আমরা পাইকারদের বেশি কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি না। জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, বেশি দাম লাগলে ডিম নেওয়ার দরকার নেই। তাই আমরা চুপচাপ নিয়ে এসে বিক্রি করি।”
মিরপুর ২ নম্বরের জিদান জেনারেল স্টোরে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি করছে ১৪৮ থেকে ১৫০ টাকা করে। দাম কেন এত বাড়লো জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, “আমরা তো জানি না, পাইকাররা জানে। আমরা বাজারের থেকে একটু বেশিতে বিক্রি করি এলাকায়। কারণ, আমাদের আনতে ভাড়া লাগে। না হলে তো আমাদের এলাকায় বিক্রি করে পোষাবে না।”
পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে দাম বাড়ে বেলায় বেলায়
মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজারে মেসার্স রাজিব পুষ্টি বিতান থেকে এই বাজারের বেশির ভাগ খুচরা বিক্রেতা ডিম কিনে থাকেন। আজকে সকালেও অনেক খুচরা বিক্রেতা প্রতিদিনের মতো ডিম নেন। খুচরা বিক্রেতারা প্রতি একশত লাল ডিম নেন এক হাজার ৩০ টাকা, সাদা ডিম ৯৭০ টাকা এবং হাঁসের ডিম এক হাজার ৩০০ টাকা দরে।
দুপুর ১টার দিকে রাজিব পুষ্টি বিতানে গেলে দেখা যায়, তারা দোকানের সামনে নতুন মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রেখেছে। সেই তালিকায় প্রতি একশত লাল ডিম এক হাজার ৫০ টাকা, সাদা ডিম ৯৯০ টাকা এবং হাঁসের ডিম এক হাজার ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সব ধরনের ডিমের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৫০ টাকা।
রাজিব পুষ্টি বিতানের মাহফুজ বলেন, “আমাদের মূল্য তালিকা দেওয়া আছে। ওই দামেই আমরা বিক্রি করছি প্রায় ৩-৪ দিন ধরে।” এ সময় তাকে আজকের বিক্রি করা রসিদ দেখালে তিনি বলেন, “আমি এটা জানি না।”
একই বাজারের আরেক পাইকারি বিক্রেতা ভাই ভাই ট্রেডার্স এগ বাজারের মূল্য তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে মুরগির প্রতি একশত লাল ডিম এক হাজার ৭০ টাকা ও সাদা ডিম এক হাজার টাকা। দাম অন্য জায়গার থেকে বেশি কেন জানতে চাইলে ভাই ভাই ট্রেডার্স এগ বাজারে কর্মরত একজন বলেন, “আমরা তেজগাঁও থেকে ডিম আনি না, ময়মনসিংহ থেকে আনি। তাই আমাদের খরচ বেশি পড়ে। এই কারণে আমাদের দামও বেশি পড়ে যায়।”