শিশুকিশোরদের স্ক্রিনটাইম নিয়ে অনেক অনেক আলোচনা হয়েছে, বিষয়টি এখন পুরোনো হয়ে গেছে। তাই অনেক অভিভাবক বিষয়টা আর কানে তুলতেই চান না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা উপেক্ষা করা ঠিক নয়। বরং সময়মতো সচেতন হওয়া জরুরি।
মার্কিন শিশু বিশেষজ্ঞ কেলিন স্মাইথ বলেন, আমরা এখনো ডিজিটাল জীবনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্তু যেটুকু তথ্য আছে, তাতে স্পষ্ট যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কিশোর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যমে কাটায়। অল্প বয়সে বারবার সামাজিক মাধ্যমে চেক করার অভ্যাস শিশুর মস্তিষ্কের ‘ভালো ও মন্দ’ বোঝার ক্ষমতা পাল্টে দিতে পারে।
আর কেবল বড়রা নয়, ৫ থেকে ৭ বছরের শিশু, এমনকি ২ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুরাও এখন স্মার্টফোনে আসক্ত হচ্ছে।
গবেষণা বলছে, স্ক্রিনটাইমের চেয়ে স্ক্রিনে আসক্তি বেশি চিন্তার বিষয়। কারণ যারা ফোনে বা স্ক্রিনে আসক্ত তাদের মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেশি।
ফোন বা স্ক্রিন আসক্তি কী
সহজ করে বললে, যদি আপনার সন্তান বন্ধু, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে স্ক্রিনকে বেছে নেয় এবং চাইলে বা বুঝেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাহলে তাকে স্ক্রিনে আসক্ত বলা যায়।
স্ক্রিন বলতে বোঝায়, মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার, টিভি সবই।
স্ক্রিন আসক্তির পেছনে বড় কারণ হলো ডোপামিন হরমোন। সামাজিক মাধ্যম বা গেম ব্যবহার করলে মস্তিষ্কে এই ‘ভালো লাগার’ হরমোন নিঃসৃত হয়। এতে ধীরে ধীরে শিশুরা সেই অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আসক্ত শিশুরা তাদের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সময় ফোন বা স্ক্রিনে থাকে। ফোন বন্ধ থাকলে তাদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে। তারা আবার কখন ফোন ব্যবহার করতে পারবে, সেটা নিয়ে চিন্তিত থাকে।’
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল। কারণ তারা অনেক সময় বুঝতেই পারে না, এটা একটি সমস্যা। ফলে তাদের কাছে এটাই ‘স্বাভাবিক জীবন’ হয়ে যায়।
সন্তানের ফোন বা স্ক্রিন আসক্তির লক্ষণ
বিশেজ্ঞরা কিশোরদের ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণের কথা বলেছেন। তারা এটাও বলেছেন এই লক্ষণগুলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মাকে সতর্ক হতে হবে।
লক্ষণগুলো হলো—বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না করা, খেলাধুলা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে না গিয়ে ফোনে সময় কাটানো। ফোন বন্ধ করতে বললে রেগে যাওয়া বা চিৎকার করা। মন খারাপ হলে মোবাইল বেছে নেওয়া। স্কুল ফাঁকি দেওয়া এবং উদ্বিগ্ন ও হতাশ থাকা। ওজন, ঘুম বা শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া।
Manual2 Ad Code
কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ হলো—সারাক্ষণ স্ক্রিন নিয়ে বসে থাকা। খেলাধুলা বা অন্য কাজে আগ্রহ থাকে না। মোবাইল বা ট্যাব হাতে না পেলে কান্না বা বিরক্তি প্রকাশ করে। হাতে মোবাইল না পেলে খেতে চায় না।
হঠাৎ পুরোপুরি বন্ধ করলে সমস্যা হতে পারে
আপনি যদি হঠাৎ ফোন ব্যবহার বন্ধ বা স্ক্রিন কমান, তখন শিশুর মধ্যে উইথড্রয়াল লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারণ স্ক্রিন আসক্তি অনেকটা নেশার মতোই কাজ করে।
লক্ষণগুলো হতে পারে—অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিরক্তি, মেজাজ খারাপ, কিছুই ভালো না লাগা, বারবার মোবাইল দেখতে চাওয়া, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা ইত্যাদি।
Manual5 Ad Code
অনেক কিশোর আবার পকেটে মোবাইল না থাকলেও বারবার হাতড়ে দেখে, এটাকে বলা হয় ফ্যান্টম ফোন সিনড্রোম। তবে ভালো ব্যাপার হলো, এই সময়টা খুব বেশি স্থায়ী হয় না। সাধারণত কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হয়।
এরপর ঘুম ভালো হয়, মানসিক শক্তি ও মনোযোগ বাড়ে, উদ্বেগ ও হতাশা কমে, সৃজনশীলতা বাড়ে, মানুষ ও বাস্তব জীবনের প্রতি আগ্রহ ফিরে আসে।
কীভাবে সন্তানের আসক্তি কমাবেন
হঠাৎ সবকিছু বন্ধ না করে, সন্তানের সঙ্গে আলাপ করে নিয়ম ঠিক করুন। যেমন—কখন, কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করবে। এজন্য টাইমার ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া পরিবারের সবাই মিলে কিছু নিয়ম মানতে পারেন, যেমন খাবারের সময় ফোন নয়।
সন্তানকে নিয়ে পার্কে যেতে পারেন। সেখানে হাঁটাহাঁটি ও খেলাধুলা করতে পারেন। মাঝে মাঝে বাসার পাশের লাইব্রেরিতে নিয়ে যান।
তাহলে শিশু বুঝতে পারবে ফোন বা স্ক্রিন ছাড়া জীবন কষ্টের নয়, বরং আনন্দের।
স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ করলে শিশুরা শুরুর দিকে বিরক্ত হতে পারে। তবে বিশেজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের বিরক্ত হতে দিন। কারণ বিরক্তি থেকে আসে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তা।
Manual4 Ad Code
নিজে সচেতন হোন
আপনি যদি সারাক্ষণ ফোনে থাকেন, তাহলে সন্তানকে বোঝানো কঠিন হবে। তাই সন্তানের সামনে অকারণে ফোন দেখবেন না, কাজের সময় ও পারিবারিক সময় আলাদা করুন। মাথায় রাখুন মোবাইলের চেয়ে সন্তানের সুন্দর জীবন জরুরি।
প্রয়োজনে সাহায্য নিন
যদি সন্তানের আচরণে বড় ধরনের পরিববর্তন দেখেন তাহলে এখনই সচেতন হন। যেমন—মন খারাপ, ক্লান্তি, রাগ।
এসব লক্ষণ দেখলে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিন। মনে রাখবেন, বিশেজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটাই সচেতন অভিভাবকের বৈশিষ্ঠ্য।
আধুনিক সময়ে হয়তো স্ক্রিনটাইম পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।