আজ রবিবার, ১২ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঈদের পরই নতুন সরকারের সামনে যে বড় তিন চ্যালেঞ্জ

editor
প্রকাশিত মার্চ ২১, ২০২৬, ০৮:৪২ অপরাহ্ণ
ঈদের পরই নতুন সরকারের সামনে যে বড় তিন চ্যালেঞ্জ

Manual8 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি নিয়ে চিন্তা বাড়ছে। যার প্রভাব পড়তে পারে কৃষি ও শিল্প-কলকারখানাসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ঠিক সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। পুরোপুরি স্থির নয় রাজনীতির ময়দানও।

সব মিলিয়ে ঈদের পর নানামুখী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে মাত্র এক মাস আগেই গঠিত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে।

অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশিলতা – মোটাদাগে এই তিনটিই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।

তারা বলছেন, দীর্ঘ দিনের একটি বিশেষ পরিস্থিতির পর দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মেটানোই নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি।

এছাড়া নির্বাচনের আগে সরকারি দল তাদের ইশতেহারে প্রত্যাশা পূরণে যেসব বার্তা দিয়েছে সেগুলো তারা কতটা ধারণ করতে পারে – সেদিকেও নজর থাকবে সাধারণ মানুষের।

 

স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনসহ নানা ইস্যু রাজনৈতিকভাবেও নতুন সরকারকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আর ঈদের পর দেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে সেটি মানছেন সরকারের মন্ত্রীরাও।

তারা বলছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরই দেশের মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে নতুন সরকার, ঈদের পর যার গতি আরও বাড়বে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক পুণর্গঠনই এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

উপসাগরীয় এলাকার অনেক জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে

‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ নিয়েই বেশি চিন্তা

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় এক মাস ধরে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে এ মুহূর্তে গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের জন্যও সব চেয়ে গুরুত্ব জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি।

ঈদের আগেই জ্বালানি নিয়ে দুর্ভোগের আঁচ কিছুটা হলেও পেয়েছে সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়ার সাথে যে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশেষ করে বাংলাদেশে এপ্রিল-মে মাসে প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের চাহিদা এবং ফসল আবাদে জ্বালানির চাহিদা বড় চিন্তার কারণ হতে পারে বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

Manual4 Ad Code

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলছেন, ঈদের পর অফিস-আদালত এবং শিল্প-কারখানাগুলো পূর্ণ শক্তিতে চালু হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

এছাড়া কৃষি উৎপাদনে সার ও সেচের জন্য জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়বে।

এক্ষেত্রে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলছেন, “জ্বালানি তো এখনই বেশ চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। এমন একটি সময় যখন আমাদের দেশের রাজস্ব আয়েও বড় ঘাটতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি।”

এছাড়া জ্বালানি চাহিদা মেটাতে অধিক মূল্য পরিশোধ করতে রিজার্ভ থেকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করা লাগতে পারে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চের শুরু থেকেই কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে (ফাইল ছবি)

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ঈদের পরে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

তিনি বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, এর নেতিবাচক প্রভাব এরইমধ্যে বিশ্বব্যাপী পড়তে শরু করেছে।

Manual5 Ad Code

সম্প্রতি সৌদি আরবের রিয়াদে- আমেরিকা, এশিয়াসহ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি মন্ত্রীদের বৈঠকের কথা উল্লেখ করে মি. মাহমুদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় বিশ্বের প্রায় সব দেশই।

এছাড়া জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তার ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ অন্য সব সেক্টরেও পড়তে পারে বলেও মনে করেন জ্বালানি মন্ত্রী।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “জ্বালানি তেলের সঙ্গে সব কিছু সম্পর্ক যুক্ত – অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প উন্নয়ন যাই বলেন না কেন।”

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে জ্বালানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহের মত প্রস্তুতি সরকার নিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

তবে, তিনি বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি তো আমাদের হাতে নেই, তাই ধৈর্য্য ধরে, সাশ্রয়ী ব্যবহার করার মাধ্যমে আমাদেরকে টিকে থাকতে হবে।”

ঈদের পর জ্বালানির দাম বাড়বে কী-না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. মাহমুদ বলেন, “দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আমরা এখনও নেইনি। তবে যুদ্ধ চলতে থাকলে তো কিছু করার থাকবে না।”

Manual3 Ad Code

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অধিবেশনের প্রথম দিনেই ওয়াক আইন করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা

রাজনীতির মাঠে যেসব চ্যালেঞ্জ

ঈদের পর দেশের রাজনীতির মাঠেও নতুন সরকারকে নানা সমীকরণের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, বিরোধী দলের দাবি ও আন্দোলন, এমন নানা বিষয় ঈদের পর সরকারের সামনে খুব কম সময়ের মধ্যেই হাজির হবে।

Manual8 Ad Code

এমন প্রেক্ষাপটে সরকার ঠিক কী ধরণের পদক্ষেপ নেয়, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশেষ করে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলো সরকারে বসে দলটি কতটা ভুল প্রমাণ করতে পারবে সে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, “স্থানীয় সরকার বা প্রশাসনে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি দলের লোক দিয়েই। এ ধরণের দলীয়করণ জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

এছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জুলাই সনদ ইস্যুতে বিরোধী দলের দাবিদাওয়া ও আন্দোলনের মতো কর্মসূচিও সরকারকে চাপে ফেলতে পারে, বলছেন তিনি।

“সংসদের বিরোধীরা যে জুলাই সনদ ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখবে – এটা নিশ্চিত,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমদ।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জুলাইয়ের বিভিন্ন মামলায় আসামিদের বিচার নিয়েও সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে পারে বিরোধীরা।

তবে, এই মূহুর্তে রাজনীতি নয় দেশের অর্থনীতি ঠিক করাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ।

তিনি বলছেন, “রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তো সবসময়ই থাকবে, আমরা এগুলো আলোচনা করে সমাধান করবো। তবে, দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে অচলবস্থা তৈরি হয়েছে এমন পেক্ষাপটে দেশকে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”

মি. মাহমুদ বলছেন, “দেশের অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে যে একটা ডিজাস্টার হয়ে গেছে সেটাকে তুলে আনাটাই তো আমাদের কাছে সবচে বড় চ্যালেঞ্জ।”

জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে

অর্থনীতি নিয়ে বাড়তি ভাবনা

এদিকে, অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।

দেশের অর্থনীতিতে আগে থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। সেখানেএখন বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি সংকট আরও বাড়াতে পারে বলেই মত তাদের।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, অন্য সব পণ্যের মূল্য নির্ধারণের বড় নির্ণায়ক হলো জ্বালানি। তাই জ্বালানির দামে প্রভাব পড়া মানে সব পণ্যের দামই প্রভাবিত হবে।

এছাড়া ঈদের পরেই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সামনের অর্থ বছরের বাজেট।

কেননা, নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বাজেটে কী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে – এবার সেদিকে নজর থাকবে সাধারণ মানুষের।

এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষার যেসব পদক্ষেপ স্বল্প পরিসরে সরকার ইতোমধ্যেই নিয়েছে সেগুলোও বাজেটে সম্প্রসারণ করতে হবে।

মি. রহমান বলছেন, “সরকার তো ইতোমধ্যেই বাজেট তৈরির কাজে হাত দিয়েছে। এই বাজেটে ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্ব আয়ের সামঞ্জস্য করাটা তাদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জ হবে।”

কৃষি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও ঈদের পর সরকারকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি নিয়ে যে অনিশ্চয়তার শঙ্কা তৈরি হয়েছে তাতে সার উৎপাদন এবং সেচের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চিন্তার কারণ হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহামান বলছেন, কৃষি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সার রাখা এবং কৃষকদের কাছে পৌঁছানো জরুরি।

দেশি বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও এই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই সচেষ্ট হতে হবে সরকারকে। তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা