ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে নানা ঘটনা চোখে পড়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ‘মিটিমিটি হাসি’র খণ্ডচিত্র ছিল নজর কাড়ার মতো। এই তালিকায় ছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি ও বিরোধী দলের সিনিয়র নেতারাও।
Manual4 Ad Code
গ্যালারিতে থাকা সংবাদকর্মীরা আগে থেকেই জানতাম যে, রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেওয়ার সময় জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াক-আউট করবেন। বিষয়টি নিশ্চয় রাষ্ট্রপতিরও অজানা ছিল না। রাষ্ট্রপতি যখন অধিবেশন কক্ষে স্পিকারের পাশে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসলেন, তখনই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে সংসদে তার ভাষণের বিরোধিতা শুরু করেন।
অল্পক্ষণেই এই বিরোধিতা হট্টগোলের পর্যায়ে গড়ায়। জাতীয় সংগীত বাজানো শুরু হলে একপর্যায়ে হট্টগোল বন্ধ হয়। তবে জাতীয় সংগীত শেষে আবারও হট্টগোল শুরু করেন জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা।
Manual1 Ad Code
এসব দেখতে দেখতে হঠাৎই চোখ গেল রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দিকে। সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত ১ নম্বর সংসদ গ্যালারি থেকে রাষ্ট্রপতির সুচারু গোঁফের নিচে এক চিলতে মুচকি হাসির রেখা দেখা গেল। অর্থাৎ, পূর্বনির্ধারিত এই পর্বটির প্রস্তুতি নিয়েই হয়তো রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে ঢুকেছিলেন।
ঠিক নিশ্চিত নই, তবে তার মুচকি হাসিটিতে এক ধরনের তাচ্ছিল্যও হয়তো ছিল। কারণ, জাতীয় সংসদে যারা রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করছিলেন, তাদের মধ্যে একজন সাহাবুদ্দিনের মাধ্যমেই শপথ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় ঢুকেছিলেন। ১৩৩টি অধ্যাদেশ ও জুলাই সনদের যে আদেশ বিরোধী জোট বাস্তবায়ন করার দাবি জানাচ্ছে, সেটাতেও তো এই সাহাবুদ্দিনেরই সই! এ কারণে রাষ্ট্রপতির মুখে মুচকি হাসি বা তাচ্ছিল্য যেটাই থাকুক, সেটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
Manual5 Ad Code
যারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিএনপি নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত বক্তব্য পড়ে ‘মোনাফেকি’ করেছেন, তারা কি একই ধরনের মোনাফেকি থেকে মুক্ত?
এই যখন পরিস্থিতি, তখন অস্কার ওয়াইল্ডের বিখ্যাত উক্তিটিকে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি হলো সেই ভণ্ডামি, যা আমরা নিজেরা উপলব্ধি করতে পারি না।’
যাই হোক, জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করার সময় পরিস্থিতি কিছুটা ঘোলাটে মনে হচ্ছিল। তখন সরকারি দলের চিফ হুইপ রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে ভাষণ শুরু করার অনুরোধ জানালে রাষ্ট্রপতি হট্টগোলের মধ্যেই সাবলীলভাবে ভাষণ শুরু করেন। যেন এমনই প্রস্তুতি ছিল!
ভাষণ শুরুর পরও হট্টগোল না থামায় সংসদ নেতা তারেক রহমানকেও কিছুটা উদ্বেগ নিয়ে তার ডানপাশে থাকা মির্জা ফখরুল ইসলাম ও সালাহউদ্দিন আহমেদের দিকে তাকাতে দেখা গেল। তাদের মধ্যে কী কথা হচ্ছিল তা গ্যালারি থেকে বোঝার উপায় নেই। তবে মনে হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অনেকটা নির্ভার ভঙ্গিতে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছিলেন যে জামায়াত কিছুক্ষণের মধ্যেই অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা কক্ষ ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের দুই শতাধিক সংসদ সদস্য টেবিল চাপড়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে স্বাগত জানান। তখন প্রধানমন্ত্রীর ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি দেখা যায়—মুচকি হাসি।
মুচকি হাসি এখানেই শেষ নয়। রাষ্ট্রপতি যখন তার ভাষণে গত ১৭ বছরের শেখ হাসিনার সময়কালকে ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করছিলেন, তখনো একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী তার ডানপাশের সিটে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে নানান ভঙ্গিতে কথা বিনিময় করছিলেন।
গ্যালারি থেকে তাদের কথা শুনতে পাইনি, তবে সবার মুখে মুচকি হাসি দেখেছি। যেটাকে অনেকে বলি ‘মিটিমিটি হাসি’।