গায়েবি স্ত্রী’ বানিয়ে মামলা: শেখ হাসিনাসহ সব আসামির অব্যাহতি
গায়েবি স্ত্রী’ বানিয়ে মামলা: শেখ হাসিনাসহ সব আসামির অব্যাহতি
editor
প্রকাশিত মে ১৫, ২০২৬, ০২:৪৩ অপরাহ্ণ
Manual4 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা ব্রিজ এলাকায় বুকে গুলি লেগে স্ত্রী ফাতেমা নিহত হওয়ার অভিযোগ এনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন মো. সুমন নামে এক ব্যক্তি। তবে পুলিশ তদন্তে গিয়ে জানতে পারে, এমন কোনও ঘটনায় ঘটেনি। ভুক্তভোগী ও বাদী কেউ কাউকে চেনেন না। কিছু ব্যক্তির প্ররোচনায় ও আর্থিক প্রলোভনে মামলা করে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করে সুমন। আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে সুমনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রার্থনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
Manual4 Ad Code
গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে ওই মামলা করে সুমন। সে নিজেকে ফাতেমার স্বামী বলে পরিচয় দেয়। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট মোহাম্মদপুরের বছিলা ব্রিজ এলাকায় বুকে গুলি লেগে ফাতেমা নিহত হন।
Manual5 Ad Code
মামলায় অপর উল্লেখযোগ্য আসামি হলেন– সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক হারুন-অর-রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস।
Manual5 Ad Code
এ মামলায় গ্রেফতার আসামিরা হলেন– কামরুল ইসলাম, এটি নিজাম উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, রাসেল মিয়া, সৈকত ইসলাম কামরুল, আব্দুল মুকিত মজুমদার ও বিল্লাল ওরফে ভাতিজা বিল্লাল। তাদের মধ্যে বিল্লাল সন্ধিগ্ধ এবং অপর আসামিরা এজাহারনামীয়। বিল্লাল জামিনে আছেন, বাকিরা কারাগারে।
এদিকে তদন্তে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। পরে ৮৫ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে গত ২৭ এপ্রিল আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহাদাত হোসেন। বাদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন (মামলা) দায়েরের সুপারিশ করেছেন তিনি।
সোমবার (১১ মে) মামলার দিন ধার্য ছিল। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম আগামি ২৪ জুন শুনানির পরবর্তী দিন রেখেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।
এদিকে এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে গত ২৭ এপ্রিল আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। তদন্তে যা পেয়েছি সেটাই ফাইনাল রিপোর্টে উল্লেখ করেছি।’ এর বেশি আর কিছু বলতে অনীহা প্রকাশ করেন শাহাদাত হোসেন।
প্রতিবেদনে এসআই শাহাদাত হোসেন বলেন, বাদী সুমনকে মামলা সংক্রান্তে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ-পত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু তিনি কোনও ধরনের কাগজপত্র সরবরাহ করেননি। বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, ফাতেমাকে আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
সেখানে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে ও গোরখোদকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলে তারা জানান, কবরস্থানটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না। যে কেউ চাইলেই কবরস্থানে কাউকে কবর দিতে পারে না। হত্যা, আত্মহত্যার কোনও লাশ সেখানে দাফন হয় না। সমাজভুক্ত না হলে সেখানে দাফনের সুযোগ নেই। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কোনও ব্যক্তির লাশ সেখানে দাফন করা হয়নি বলে জানান কবরস্থান কর্তৃপক্ষ।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ফাতেমাকে হাসপাতালে ভর্তির কোনও কাগজপত্র সরবরাহ করেননি বাদী। সুমনের সঙ্গে বারবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা চেষ্টা করা সত্ত্বেও তিনি সাড়া দেননি। তার দেওয়া ঠিকানায় গিয়েও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
Manual6 Ad Code
এদিকে মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনে ২৩ জন নিহত হন। তাদের সবাই পুরুষ। সেখানে কোনও নারীর মৃত্যুর তথ্য নেই। সুমন ফাতেমার মৃত্যুসংক্রান্ত বিষয়ে কোনও সনদ সরবরাহ করতে পারেননি।
বাদীকে মামলা সংক্রান্তে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে স্বীকার করেন, তিনি ভুক্তভোগীকে চেনেন না। তিনি জানেন না আদৌ ওই নামে কোনও ভুক্তভোগী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত হয়েছেন কিনা? ফাতেমা নামে বা ওই ঠিকানা কোনও ব্যক্তি বাস্তবিক পক্ষে আছেন কিনা তাও তিনি জানেন না।
সুমন জানান, কতিপয় ব্যক্তির প্ররোচনায় ও আর্থিক প্রলোভনে পরে তিনি মামলার বাদী হতে রাজি হন। কিন্তু তিনি নিজেও জানতেন না মামলা কার কার বিরুদ্ধে এবং কি ধরণের মামলা দায়ের করেছেন। তাকে কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া হয়নি আসামি বা সাক্ষী কারা। বাদী যখন বুঝতে পারেন তিনি প্রলোভনে পড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ব্যক্তির স্বজন হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করে রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্যায় করেছেন তখন তিনি যাদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে মামলা দায়ের করেন তাদের স্বরণাপন্ন হন। কিন্তু তারা তাকে জানায়, এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরবর্তী সময়ে বাদী ভীত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। মামলার বিষয়ে আগ্রহহীন হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেও আর কোনোভাবেই তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ফাতেমা নামে কোনও ভুক্তভোগীর অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়ায় কিংবা তার মারা যাওয়ার বিষয়ে কোনেও তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় এবং মামলার এজাহারে উল্লেখিত স্থানে ও সময়ে এজাহারনামীয়, অজ্ঞাত বা সন্ধিগ্ধ আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। একইসঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়ের করায় সুমনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন দাখিলের আবেদন করা হয়।
বিল্লালের আইনজীবী মোস্তফা আল মামুন বলেন, এমন মামলা ভুড়ি ভুড়ি হচ্ছে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে, বিরোধীদের সঙ্গে এমনটা করে। আমরা এমনটা চায় না। অযথা আর কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়। এমন মামলার উদ্ভব যেন আর না হয়, সেই প্রত্যাশা থাকবে।
এ বিষয়ে মামলার বাদী সুমনের বক্তব্য জানতে মোবাইলে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তার ব্যবহৃত মোবইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।