স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ ছাড়া সব কয়টি নির্বাচনে গোপালগঞ্জের তিনটি আসন থেকে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামানত পর্যন্ত হারিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি। এখান থেকে তার মেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার জয়লাভ করেছেন। এই পরিবারের সদস্য শেখ সেলিমও দীর্ঘ সময় এখান থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আরেকটি আসনে ফারুক খান প্রায় তিন দশক ধরে সংসদ সদস্য হয়েছেন। শেখ হাসিনা আটবার, সেলিম সাতবার এবং ফারুক ছয়বার সংসদ সদস্য হয়েছেন এই জেলা থেকে।
কিন্তু ৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে সারাদেশের মত আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটি’ গোপালগঞ্জেরও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা অধিকাংশই আত্মগোপনে কিংবা নিষ্ক্রিয়। এই অবস্থায় রাজনীতির মাঠে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যদের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
আওয়ামী লীগ বিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন।
সারাদেশে অধিকাংশ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও এই জেলায় তেমনটি হয়নি। এখানের তিনটি আসনের একটি গণঅধিকার পরিষদ, একটি হিন্দু মহাজোট এবং আরেকটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।
জেলায় মোট ভোটার ছিলেন ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬১৮ জন। বৃহস্পতিবার ৩৯৭টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটের শুরু থেকেই এখানে প্রচার ছিল সীমিত। ভোটের উৎসবের আমেজ প্রায় ছিল না। ফলে ধারণা করা হচ্ছিল, এখানে হয়ত ভোটের হার কম হবে।
সারাদেশে এই নির্বাচনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পড়লেও এখানে ভোটের হার ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। যদিও এখানে বিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে কোনো কোনো আসনে ৮০-৮৫ শতাংশ ভোট পড়ার ইতিহাসও আছে।
স্থানীয়ভাবে যারা ভোট পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের অভিমত, এখানে বিএনপি বা অন্য দলগুলোর বড় ‘ভোট ব্যাংক’ না থাকলেও তারা আওয়ামী লীগের ভোট এবং হিন্দু ভোট নিজেদের বাক্সে নিতে পেরেছেন।
‘নিরাপদে থাকতে বিএনপিকে ভোট দিয়েছি’
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কুশলী গ্রামের ভোটার আরমান আলী সিকদার (৫৫) বলছিলেন, “আমাদের আসন টুঙ্গিপাপাড়া-কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে। এখানে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার পৈতৃক বাড়ি। রাজনৈতিকভাবে এ আসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
“এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না। বিএনপি এ আসনে এস এম জিলানীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি আমাদের বাড়ি বাড়ি এসে দোয়া ও ভোট চেয়েছেন। দিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। আমাদের মন তিনি সহজে জয় করে নিয়েছেন। এ কারণে তিনি বিজয়ী হয়েছেন।”
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমরিয়া গ্রামের তরুণ ভোটার কলেজ ছাত্র আসালত হোসেন তালুকদার (২০) বলেন, “তারেক রহমানের রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা আমার ভাল লেগেছে। এ ছাড়া আমাদের ভোট টানতে জিলানী ভাই প্রচারে তরুণদের ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে তারুণ্যের ভোট তার পক্ষে গেছে।”
কোটালীপাড়া উপজেলার পীড়ারবাড়ি গ্রামের কৃষক নিখিল হালদার (৬০) বলেন, “আওয়ামী লীগ নেই। আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? নিরাপদে থাকতেই আমরা আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে নির্বাচনে করেছি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবেন, এমনটা আমি আশা করি।”
Manual6 Ad Code
সনাতন মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু শিবু ঠাকুর বলেন, “গোপালগঞ্জ জেলার তিন আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা আমাদের কাছে এসেছেন। আমরা তাদের সমর্থন দিয়েছি। তারা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভাল ভোট পেয়েছেন। এজন্য তাদের বিজয় সহজ হয়েছে।”
Manual7 Ad Code
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন গোপালগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেছেন, “আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে এবারের ভোটে আওয়ামী লীগ ছিল না। এ জেলার অধিকাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের ভোটার। দলটি নেই। এ সুযোগে নিরাপত্তা, উন্নয়ন, হয়রানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। গেছেন ভোটারদের কাছে। তাদের ক্যারিশমায় ভোটাররা এবার বিএনপির দিকে ঝুঁকেছেন। এসব কারণে বিএনপি জিতেছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।”
‘এটি বড় বার্তা’
গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এস এম জিলানী।
তিনি ‘আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে’ বিএনপির বিজয় সম্পর্কে বলেন, “এটি একটি বড় ধরনের বার্তা। আসলে জনকল্যাণে রাজনীতি করা। নির্বাচনি এলাকার মানুষ আমাকে তাদের আপন ভাই হিসেবে, ঘরের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আগামীতেও আমার এই কাজগুলো অব্যাহত থাকবে।”
ভোটারদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা বলতে গিয়ে জিলানী বলেন, “রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে। তারা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি তাদেরকে সম্মান জানাই। তারা আমাকে যে সম্মানিত করেছে আমি তার মর্যাদা রাখব। ভোটারদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য কাজ করব।”
গোপালগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত ডা. কে এম বাবর বলেন, “নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।”
ভবিষ্যতে গোপালগঞ্জের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং উন্নয়নের স্বার্থে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
কার কত ভোট
গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর ও কাশিয়ানীর একাংশ) আসনে বিএনপির প্রার্থী সেলিমুজ্জামান মোল্লা ধানের শীষ প্রতীকে ৬৮ হাজার ৮৬৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া ট্রাক প্রতীকে পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৯৬১ ভোট।
গোপালগঞ্জ-২ (সদর ও কাশিয়ানীর একাংশ) আসনে বিএনপি প্রার্থী ডা. কে এম বাবর ধানের শীষ প্রতীকে ৪০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু হরিণ প্রতীকে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট।
গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী এস এম জিলানী ধানের শীষ প্রতীকে ৬০ হাজার ১৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৬৭ ভোট ।
কোন আসনে কত ভোট
গোপালগঞ্জ-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫১০। এখানে বৈধ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৯টি। বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ৪৬৮ ভোট। ভোট পড়েছে ৪৯.৬৭ শতাংশ।
গোপালগঞ্জ-২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৩২৪। এখানে বৈধ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬২১টি। বাতিল ভোট ৪ হাজার ৪৬৪। ভোটের হার ৩৯.৮৩ শতাংশ।
গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪। এখানে বৈধ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬৫টি। বাতিল ভোট ৪ হাজার ২০ ভোট। ভোটের হার ৪৪.২০ শতাংশ।
‘না’ ভোট অনেক বেশি
গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হয়েছে।
জেলায় গণভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৫১ হাজার ৪২৭ ভোটার। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬ জন ‘না’ ভোট দিয়েছেন। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৬ জন।
এর মধ্যে গোপালগঞ্জ-১ আসনে গণভোট পড়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ১৪টি। এর মধ্যে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮ ভোটার। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার ৭১৬টি।
গোপালগঞ্জে-২ আসনে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯২ ভোটার গণভোটে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্য ‘না’ ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০ জন। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৩৪ হাজার ৩০২ ভোটার।
গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন গণভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ‘না’ বাক্সে পড়েছে ৯৩ হাজার ৩৬৮ ভোট। ‘হ্যাঁ’ বাক্সে পড়েছে ৩৩ হাজার ৪৯৮ ভোট।