মিয়ানমারে কী ঘটছে, বাংলাদেশ সীমান্তে এত আতঙ্ক কেন?
মিয়ানমারে কী ঘটছে, বাংলাদেশ সীমান্তে এত আতঙ্ক কেন?
editor
প্রকাশিত জুলাই ৩, ২০২৬, ০২:২৯ অপরাহ্ণ
Manual1 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
বুধবার (১লা জুলাই) রাত। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ৯টা ৩৭ মিনিট। হঠাৎ একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে কমপক্ষে চার দফা শক্তিশালী বিস্ফোরণ। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ।
রাতের আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার (০২রা জুলাই) সকাল-বিকালে আবারও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায় দেশটির সামরিক জান্তা। সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফের জাদিমোড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা বারবার প্রকম্পিত হয়।
সীমান্তের বাসিন্দারা বলছেন, বহু মাস পর আবারও ওপারের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব অনুভব করছেন তারা। অন্যদিকে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। মিয়ানমারে থাকা স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো রোহিঙ্গা। একই সঙ্গে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় টেকনাফ সীমান্তে জল ও স্থলপথে টহল এবং নজরদারি জোরদার করেছে বিজিবি।
ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বলছেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের তথ্য এবং সীমান্তবাসীর বর্ণনা অনুযায়ী, মংডু ও বুথিডংয়ে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক দুই দিনে প্লেন থেকে প্রায় ৩০টি হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে হতাহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বসতঘর ধ্বংস হয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর রাখাইনে আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠায় সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। যুদ্ধের অভিঘাত এখন শুধু মিয়ানমারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবাসী, জেলেদের জীবিকা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ও সীমান্ত নিরাপত্তার ওপরও।
Manual5 Ad Code
ক্যাম্পে স্বজনরা চিন্তিত
Manual1 Ad Code
মিয়ানমারের মংডু উপজেলার হাইরিয়া পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াছ প্রাণ বাঁচাতে ২০১৭ সালে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন। তবে তার অনেক স্বজন এখনও মিয়ানমারেই বসবাস করছেন। দেশটিতে চলমান সংঘাতের খোঁজখবর তিনি নিয়মিত মোবাইল ফোনে স্বজনদের কাছ থেকে নেন।
স্বজনদের বরাত দিয়ে ইলিয়াছ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালেও মংডু এলাকায় গোলার বিকট শব্দ শোনা গেছে। মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা মংডু ও বুথিডংয়ে তাদের সদরদফতর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার প্রভাব আশপাশের কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রামেও পড়েছে। এতে দুই জন রোহিঙ্গা হতাহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এ ছাড়া ২০ থেকে ৩০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
Manual3 Ad Code
তিনি আরও বলেন, ‘মংডু এলাকায় এখনো হাজারো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চলমান যুদ্ধের কারণে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন। কখন কী ঘটে, তা বলা খুবই কঠিন। কেননা গত দুই দিনে ৩০টির মতো হামলার ঘটনা ঘটেছে।’
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবাইর বলেন, ‘দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকার পর রাখাইনে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ায় আমরা গভীর উদ্বেগ ও হতাশার মধ্যে রয়েছি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সেখানে যদি আবার যুদ্ধ চলতে থাকে, তাহলে সেই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘রাখাইনে এখনও বসবাসরত রোহিঙ্গারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। চলমান সংঘাতে যদি আবারও প্রাণহানি ও সহিংসতা বাড়ে, তাহলে জীবন বাঁচাতে অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।’
মিয়ানমারের কী ঘটছে?
রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, বুধবার বুথিডং উপজেলার কিয়েত মাউক তাউং (মুসলিম) গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-১২ (Y-12) উড়োজাহাজ ব্যবহার করে বোমা নিক্ষেপ করে।
এতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্তের লোকজনের ঘরবাড়ি। আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভাবছেন।
এ বিষয়ে টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আনিছুর রহমান বলেন, হঠাৎ ভয়াবহ ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠছে। পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদের ওপারে আগুনের লেলিহান শিখাও দেখা গেছে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আগুনের ঝলক আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। বিস্ফোরণটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আরাকান আর্মির ছোড়া মর্টার শেলের বিস্ফোরণ হতে পারে।
এ বিষয়ে বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা বা সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পড়ে। বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের বিজিবি-কোস্টগার্ড সর্তক অবস্থানে রয়েছে।
Manual3 Ad Code
উল্লেখ্য, টানা ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে মংডু, বুথিডং ও রাচিডং টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা (২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত) দখলে নেয় আরাকান আর্মি। দখল করা এই এলাকার বিপরীতে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা অবস্থিত। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মির অবস্থানে নতুন করে হামলা শুরু করে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। পাশাপাশি মিয়ানমারের তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গেও আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে।
তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিবিউন