শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাগারের গিনিপিগ নয়; তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হঠকারী সিদ্ধান্তের মাসুল গুনবে পুরো রাষ্ট্র।
শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষামূলক ল্যাবরেটরি বানানোর প্রয়াস থেমে নেই। এর সর্বশেষ প্রকাশ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা। এপ্রিলের পরীক্ষা জানুয়ারিতে এগিয়ে আনার এই ঘোষণা কোনো নীতিগত সংস্কার নয়, এটি ক্ষমতার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন। শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা, প্রস্তুতি, এমনকি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যে নির্মম অবজ্ঞা দেখানো হয়েছে, তা শুধু অদূরদর্শিতা নয়, এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা। প্রশ্নটা তাই সরাসরি করতে হয়, কেন এই হঠকারী সিদ্ধান্ত?
বছরের পর বছর ধরে যে শিক্ষাব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলে, যেমন ক্লাস, কোর্স, এবং পুনরাবৃত্তি শেষে এপ্রিলে পরীক্ষা। সেখানে হঠাৎ করে কোনো পূর্বঘোষণা, প্রস্তুতি বা কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াই জানুয়ারিতে পরীক্ষা এগিয়ে আনা মানে পুরো ব্যবস্থাটাকে ইচ্ছেমতো টেনে-হিঁচড়ে ভেঙে ফেলা। এটাকে কোনো বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত বলা যায় না, বরং বলা যায় নীতিনির্ধারণের নামে খামখেয়ালির চর্চা।
পরীক্ষা এগিয়ে আনার পক্ষে সেশনজট কমানোর যুক্তি সামনে আনা হয়েছে। এটি শুনতে ভালো লাগে, বলতে আরও ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস্যার শিকড়ে হাত না দিয়ে তারিখ এগিয়ে আনা মানে সমস্যাকে গোপন করা, সমাধান নয়। বই সময়মতো দেওয়া হয় না, ক্লাস ঠিকমতো চলে না, শিক্ষক সংকট কাটে না—এই কাঠামোগত ব্যর্থতাগুলো অমীমাংসিত রেখে পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে এনে বলা হচ্ছে আমরা কাজ করছি। এটি এক ধরনের প্রশাসনিক প্রতারণা।
Manual8 Ad Code
আর এতে সবচেয়ে বড় আঘাতটা পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। যারা ২০২৭ সালে পরীক্ষা দেবে, তারা ২০২৫ সালে বই পেয়েছে, তাও আবার এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। অর্থাৎ তাদের শিক্ষাবর্ষ শুরুই হয়েছে দেরিতে ও খুঁড়িয়ে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যদি বলা হয় তোমাদের পরীক্ষা তিন মাস এগিয়ে আনা হলো, তাহলে সেটি শিক্ষা নয়, সেটি একতরফা নির্দেশ। এটি এমন এক দৌড়, যেখানে শুরুর আগেই কিছু প্রতিযোগীর পা বেঁধে দিয়ে বলা হচ্ছে দৌড়াও!
শিক্ষার্থীরা কি যন্ত্র? তাদের কি মানসিক প্রস্তুতি বলে কিছু নেই? পরিকল্পনা, সময় ব্যবস্থাপনা, ধাপে ধাপে শেখা—এসব কি কেবল বইয়ের কথা? শিক্ষামন্ত্রী যেন ধরে নিয়েছেন ক্যালেন্ডারে তারিখ সরালেই বাস্তবতা বদলে যায়। কিন্তু শিক্ষা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি সময়সাপেক্ষ, ধীর এবং গভীর বিকাশের প্রক্রিয়া। এখানে শর্টকাট মানে সরাসরি অঙ্গহানি।
Manual5 Ad Code
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে ধাক্কা দেবে, তা নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই। বিশ্বজুড়ে যেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানোর কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের নীতিনির্ধারকরা উল্টো পথে হাঁটছেন। হঠাৎ করে পরীক্ষা এগিয়ে এনে লাখো শিক্ষার্থীকে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও চাপে ফেলে দেওয়া—এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চরম উদাহরণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বৈষম্যের প্রশ্ন। শহরের সচ্ছল পরিবার হয়তো অতিরিক্ত কোচিং কিংবা প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে কোনোভাবে এগিয়ে আনা সময়টা মানিয়ে নেবে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের বা নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীরা? তাদের জন্য এটি কার্যত একটি নীরব শাস্তি। অর্থাৎ একটি সিদ্ধান্ত সরাসরি সামাজিক অসাম্যকে আরও তীব্র করে তুলবে নিঃসন্দেহে।
আরেকটি অনিবার্য প্রশ্ন হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত কি কোনো গবেষণা, পরামর্শ বা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে? উত্তর: না। এখানে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো সিদ্ধান্ত আগে, যুক্তি পরে। এটি নীতিনির্ধারণ নয়, এটি এক ধরনের প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা। এই স্বেচ্ছাচারিতার ধারাবাহিকতাও নতুন নয়। প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ‘হেলিকপ্টার মন্ত্রী’ হিসেবে পরিচিতি, নকল ধরতে আকাশপথে অভিযান—এসব ছিল ক্যামেরাবান্ধব প্রদর্শনী। এখন পূর্ণ মন্ত্রী হয়ে সেই একই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। কখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে নকল চলবে না বলে হুঙ্কার, জানালার ফাঁক দিয়ে পরীক্ষার্থীরা নকল করছে কি না তা দেখা, কখনো শিক্ষার্থীদের চুলের ছাঁট নিয়ে বক্তব্য—এসব নাটকীয়তা হয়তো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সমস্যার একটিরও সমাধান করে না। বরং এটি দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল। যেখানে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন সংস্কার—এসব অতিপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের জবাব নেই, সেখানে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় সামনে এনে মূল সংকট আড়াল করা হয়।
Manual1 Ad Code
উল্লেখ্য, শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের সেখানে পড়তে যাওয়ার জন্যও উৎসাহিত করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি সচেতন মহলে বিস্ময় নয়, ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কারণ বাস্তবতা হলো, শিক্ষার বহু মৌলিক সূচকে পাকিস্তান এখনও বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, ধারাবাহিক পাঠক্রম, এমনকি শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র—সবখানেই বাংলাদেশের অগ্রগতি স্পষ্ট দৃশ্যমান। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তথাকথিত উন্নয়ন দেখে মুগ্ধ হওয়ার দাবি তথ্যবিবর্জিত। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এটি কি অজ্ঞতা, নাকি ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি?
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, এতে আত্মমর্যাদাবোধের ঘাটতি স্পষ্ট। যে রাষ্ট্রকে আমরা রক্তের বিনিময়ে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমাদের থেকে পিছিয়ে থাকা সেই রাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে নিজের দেশের মানুষকে শিক্ষা দিতে চাওয়া কোনো সুস্থ তুলনা নয়। এটি আত্মপরিচয়ের সংকট। নিজের অর্জনকে খাটো করে অন্যের বন্দনা করা কূটনীতি নয়; এটি নীতিগত দেউলিয়াত্ব এবং মানসিক পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। শিক্ষায়, অর্থনীতিতে, মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ যে এগিয়ে, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে অন্যের বন্দনা করা মানে নিজের অবস্থানকে নিজেই দুর্বল করে দেওয়া, নিজের ঘরের ভিত নড়বড়ে করে দেওয়া।
Manual6 Ad Code
এসব ডামাডোলের মধ্যে হুট করে জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা একেবারেই অবাস্তব ও ক্ষতিকর। এটি কোনো সুপরিকল্পিত সংস্কার নয়, বরং এটি একটি অপরিণত লোক দেখানো সিদ্ধান্ত, যার ভেতরে গভীরতা নেই, আছে কেবল তাৎক্ষণিক চমক। বাস্তবতা হলো, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি, পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, ক্লাস কার্যক্রম বা শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির কোনো সংযোগ নেই। অর্থাৎ একদিকে মন্ত্রী পাকিস্তানের শিক্ষার তথাকথিত উন্নয়নে মুগ্ধতার গল্প শোনাচ্ছেন, অন্যদিকে নিজের দেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এমন একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন, যার পরিণতি হবে বিশৃঙ্খলা, চাপ এবং শিক্ষার মানের অবনতি। এটি স্পষ্ট করে দেয় এখানে কোনো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা নেই, নেই কোনো সুসংগঠিত রোডম্যাপ, আছে কেবল তাৎক্ষণিক আলোচনায় থাকার প্রবণতা এবং নীতিনির্ধারণকে ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিপজ্জনক প্রবণতা।
মনে হচ্ছে আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর আসল লক্ষ্য কাজ করা নয়, আলোচনায় থাকা। তিনি কৃতিত্ব দেখাতে চান, কিন্তু সেই কৃতিত্ব অর্জনের জন্য যে যোগ্যতা, প্রস্তুতি ও গভীরতা দরকার, তা আয়ত্ত করার চেষ্টা তাঁর মধ্যে দেখা যায় না। ফলে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো হয় হঠকারী, আর বক্তব্যগুলো হয় বাস্তবতা বিবর্জিত। তিনি এখনও পুরোনো ছকবাঁধা সরলীকৃত চিন্তার বাইরে বের হতে পারেননি, যেখানে জটিল সমস্যার সহজ সমাধান খোঁজার ভান করা হয়। আর সেই কারণেই তাঁর প্রায় প্রতিটি বক্তব্য ও পদক্ষেপ বাস্তবতার সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং শেষ পর্যন্ত তা সমাধান নয়, নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, সমাধান কী? প্রথমত, এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, যদি সত্যিই সেশনজট কমানোর লক্ষ্য থাকে, তাহলে সেটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, পরবর্তী ব্যাচের জন্য আগাম ঘোষণা দিয়ে তাদের সেই অনুযায়ী প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বই বিতরণ, ক্লাস কার্যক্রম এবং পরীক্ষা সবকিছুকে একটি সমন্বিত ক্যালেন্ডারের মধ্যে আনতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মতামত ছাড়া কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কোনো মঞ্চ নয়, যেখানে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য নাটকীয়তা দেখানো যায়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যার ফলাফল নির্ভর করে স্থিরতা, পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীলতার ওপর। শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষাগারের ইঁদুর নয়, যাদের ওপর নীতি প্রয়োগ করে ফলাফল দেখা হবে। তারা একটি জাতির ভবিষ্যৎ এবং সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন উদ্ভট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অধিকার কারও নেই।
তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর